| | | | | |

নাটক নবান্ন - Theatre NABANNA 1944

নাটক নবান্ন - Theatre NABANNA 1944

রচনাঃ বিজন ভট্টচার্য (১৭ জুলাই ১৯১৫ – ১৯ জানুয়ারি ১৯৭৮)

নির্দেশনাঃ বিজন ভট্টাচার্য ও  শম্ভু মিত্র

অভিনয়ঃ বিজন ভট্টাচার্য, শম্ভু মিত্র, সুধী প্রধান, গঙ্গাপদ বসু, চারুপ্রকাশ ঘোষ, সজল রায়চৌধুরী, রঞ্জিত বসু, অজিত মিত্র, গোপাল হালদার, মণিকুন্তলা সেন, শোভা সেন, তৃপ্তি ভাদুড়ী (পরে মিত্র), ললিতা বিশ্বাস, মণিকা ভট্টচার্য প্রমুখ।

প্রথম অভিনয়ঃ ২৪ অক্টোবর ১৯৪৪ শ্রীরঙ্গম নাট্যমঞ্চ

প্রযোজনাঃ ভারতীয় গণনাট্য সংঘ

 

‘নবান্ন’ নাটক ১৯৪৪-এ, দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের সময়, আর তাঁর আঁচে সমস্ত ভারতবাসী বিপর্যস্ত। দুর্ভিক্ষ, মন্বন্তর, কালোবাজারি, আবার এর পাশাপাশি বিশ্ব জুড়ে ফ‍্যাসিজমের উত্থান আক্রমণ এবং সাম্রাজ‍্যবাদের অগ্রাসন সেসময় মানুষকে আতঙ্কিত নিপীড়িত করে তুলেছিল।

মানুষের কানে অকালের বার্তা পৌঁছে দিতে এবং এই অকালে মানুষের কর্তব‍্য ও দায়বদ্ধতা উপলব্ধি করে সচেতন করাতেই গণনাট‍্যের প্রধান ভূমিকা। আর তার জন‍্য প্রয়োজন হল নতুন প্রকাশ রীতিরঃ

১) একজন নায়ককে কেন্দ্র করে নয় একাধিক ব‍্যক্তির জীবন নিয়ে আবর্তিত হচ্ছে নাট‍্যকাহিনি এবং প্রত‍্যেকের‌ই সমান গুরুত্ব।

২) কাহিনি, অভিনয়, দৃশ‍্যসজ্জা সমস্ত কিছুতে প্রকাশ পেতে থাকল কঠোর বাস্তবতা।

৩) নাটক তখন বিনোদনের মাধ‍্যম নয়, রুজি রোজগারের মাধ‍্যম নয়, নাটক তার দর্শকের প্রতি দায়বদ্ধতা হয়ে উঠল সমাজের প্রতিবিম্ব, গণমাধ‍্যম, ক্রান্তিকালের লোকশিক্ষক।

৪) সেসময় নাটকগুলির প্রত‍্যেকটি দৃশ‍্য ও স্বয়ংসম্পূর্ণ, উন্মোচিত করছে এক একটি কঠিন বাস্তব।

৫) ভাবে ভাবনায়, নাট‍্য গঠন নাট‍্য বিষয় ও নাট‍্য প্রয়োজনায় গণনাট‍্য সংঘ বাংলা নাটকের এতদিনের ধারা ঐতিহ‍্যকে ভেঙে দিল। আর তার সার্থক প্রকাশ বিজন ভট্টাচার্যের ‘নবান্ন’ নাটকের মধ‍্যে দিয়ে।

নবান্নের প্লট সম্পর্কে নাট্যকার নিজেই বলেছেন – ‘একদিন ফেরার পথে কানে এলো, পার্কের রেলিঙের ধারে বসে এক পুরুষ আর এক নারী তাদের ছেড়ে আসা গ্রামের গল্প করছে, নবান্নের গল্প, পুজো-পার্বণের গল্প। ভাববার চেষ্টা করছে তাদের অবর্তমানে গ্রামে তখন কি হচ্ছে?’ তাঁর অভিজ্ঞতার ভেতর থেকেই এই নাট্যরূপ উঠে এসেছিল। ‘যে মানুষেরা রাস্তায় দুর্ভিক্ষের মড়া দেখে মুখ ফিরিয়ে গেছে ‘নবান্ন’ নাটক দেখিয়ে সেই মানুষদের চোখে আমরা জল ঝরাতে পেরেছি’।

নবান্নের সংলাপের মধ্যে সরল ও স্বাভাবিকতা বিশেষভাবে লক্ষণীয়। আমিনপুর ছিল মোদিনীপুরের ছদ্মনাম – তা হলেও মেদিনীপুরের উপভাষা ব্যবহার করেননি নাট্যকার। নবান্ন নাটকের সংলাপের স্বাভাবিকতার আশ্রয় তার আঞ্চলিকতা নয়, সে-আশ্রয় তার বাক্যের গঠন, শব্দের চরিত্র ও বিন্যাসে, তার বাগ্-ব্যবহারের প্রক্রিয়ায়।

‘নবান্ন’ নাটকে চারটি অঙ্কে পনেরোটি দৃশ‍্য।

‘নবান্ন’  নাটকের প্রেক্ষাপটে আছে – ১৯৪২এর আগষ্ট আন্দোলন, ১৯৪২এর প্রাকৃতিক বিপর্যয় এবং ১৯৪৩ এর মন্বন্তর।

সারাংশঃ

একটি স্নিগ্ধ গ্রাম, গ্রামের মানুষ – যারা ছিল মোটামুটি স্বচ্ছল। হঠাৎ আগস্ট বিপ্লব এলো, চাষিরা আন্দোলনে অংশ নিল এবং বেশি কিছু চাষি প্রাণ হারালো। খাদ্যাভাবে পড়লো চাষিরা, দুর্ভিক্ষের করাল থাবা নেমে এলো এইসব গরিব মানুষদের জীবনে। স্বল্পমূল্যে সুবিধাবাদীরা চাষিদের জমি হাতিয়ে নিল, জীবন সমস্যার সমাধান হলো না বরং আরো ভয়াবহ দুর্ভিক্ষ চাষিদের বেষ্টন করল ও মড়ক এলো সঙ্গে। দুমুঠো অন্নের জন্যে মানুষের হাহাকারে ভারি হয়ে উঠল আকাশ-বাতাস। চাষিরা শহরে গেল বাঁচার আশায়। কিন্তু সেখানেও মুক্তি মেলেনি। আড়তদার করল চাল মজুত, মোটা মুনাফা লুটল আর সেই মুনাফার যাতাকলে পিষ্ট হতে থাকলো সাধারণ মানুষ। শহরে ফটোগ্রাফার দুর্ভিক্ষপীড়িত মানুষের কঙ্কালসার পল্লীবধূর ছবি তুলে বাংলার ম্যাডোনা আখ্যা দিয়ে চড়া দামে বিক্রি করল। সাধারণ মানুষ শান্তি পেল না কোথাও, পেল না খানিকটা সহানুভূতি। এক লঙ্গরখানা থেকে আর এক লঙ্গরখানায় সুতো ছেঁড়া ঘুড়ির মতো টোক্কর খেয়ে বেড়ালো। অন্নহীন জনতার ভিড় থেকেই প্রতিরোধের ইঙ্গিত আসে।

নিরঞ্জন পরিত্যক্ত ভিটা আমিনপুরে ফিরে এলো এবং আবার বাসোপযোগী করে তার স্ত্রী বিনোদিনীকে নিয়ে বসবাস করতে শুরু করল। শুধু বসবাস নয়, নেতৃত্ব দিয়ে হিন্দু-মুসলমান চাষিকে সংঘবদ্ধ করল। এবং প্রতিজ্ঞা করে স্বল্পাশিষ্ট জমিতে পৃথকভাবে চাষ না করে সমবেতভাবে গতর খাটিয়ে জমিতে ফসল ফলাবার সিদ্ধান্ত নিল। নিপীড়িত চাষিরা উঠে দাঁড়ালা শুরু হলো তাদের নবান্ন উৎসব। কুঞ্জ ফিরে এলো  সাথে স্ত্রী রাধা, শহরের ফুটপাতে হারিয়ে যাওয়া অর্ধোন্মাদ প্রধান সমাদ্দারও এলো। উৎসব প্রাঙ্গনে মুখরিত হলো চাষি বউয়ের নবান্ন পালনের গানে। আর সেই উৎসব প্রাঙ্গণে ঘোষিত হ’ল আগামী দিনের শপথ।

প্রথম আলোচনাঃ

‘যুগান্তর’ পত্রিকা ২৭ অক্টোবর, ১৯৪৪ অক্টোবর লিখেছিলঃ “আগষ্ট আন্দোলন বন‍্যা, দূর্ভিক্ষ ও মহামারীর পটভূমিকায় এই নাটকের গল্পাংশ রচিত এবং যাহারা একেবারে নীচের তুলনায় বাঙ্গালার সেই দুঃস্থ কৃষকজীবন ইহার মধ‍্যে প্রতিফলিত। ইহা সত‍্য সত‍্য‌ই গণজীবনের প্রতিচ্ছবি।”

Comments

DEWRGQLNIO105202273017