| | | | | |

লোকসংগীত-গণসংগীত প্রসঙ্গ - Loksangeet Ganasangeet Prosonge

by খালেদ চৌধুরি | Khaled Chowdhury
লোকসংগীত-গণসংগীত প্রসঙ্গ - Loksangeet Ganasangeet Prosonge

লোকসংগীত বিষয়টি ব্যাপক। এই ব্যাপকতার স্বরূপ জানতে লেখাটির অবতারণা। লেখাটি কয়েক বছর আগে একটি সাময়িক পত্রিকায় সংক্ষিপ্ত আকারে প্রকাশিত হয়েছিল। বর্তমান লেখাটি পূর্ববর্তী লেখার বিশদ পরিবর্ধিত ও পরিমার্জিত রূপ। এর সঙ্গে সংযোজিত হয়েছে পরিমণ্ডল ও প্রাসঙ্গিক প্রশ্নটিও— যা লোকসংগীতের প্রাণ ও ভিত্তিভূমি। যদিও আগের লেখায় প্রাধান্য পেয়েছিল গণসংগীতের সঙ্গে লোকসংগীতের চরিত্রগত পার্থক্যের আলোচনা, এই লেখায় জোর দেওয়ার চেষ্টা করেছি লোকসংগীতের পরিমণ্ডল ও প্রাসঙ্গিকতার ওপর।

আলোচনার শুরুতে প্রথমেই লোকসংগীত ও গণসংগীতের সংজ্ঞাটা জেনে নেওয়া প্রয়োজন। লোকসংগীত বলতে আমরা কী বুঝি? এ দুটি বিষয়ে সাধারণ মানুষের ধারণা প্রায়শই অতি অস্পষ্ট, এমনকি ভ্রান্ত ধারণারও অভাব নেই। সুতরাং এই দুই সংগীতের পার্থক্য জানার জন্য প্রয়োজন এদের যথাযথ সংজ্ঞা বুঝে নেওয়া। আগেকার দিনে গ্রামোফোন রেকর্ডের লেবেলে লেখা থাকত 'খামাগীতি’, ‘পল্লিগীতি' বা ‘লোকগীতি’। এক বিশেষ ধরনের গানে এ আখ্যা ঢালাওভাবেই দেওয়া হত, শুনতে মনে হত সমার্থক বা সমগোত্রীয়। একসময়ে ব্যক্তিগতভাবে আমারও মনে হয়েছে ‘গ্রাম্যগীতি’ বা ‘পল্লিগীতি' নিছক গ্রামীণ, গ্রাম থেকেই তা রেকর্ড করা হয়েছে। 'থাম্য' কথাটার অর্থ যে 'থামজ’ তা নয়, 'থাম্যতা'-দোষে দুষ্ট বা অমার্জিতও— এই রকমটাই ভাবা হয়ে থাকে, অন্তত শহুরে দৃষ্টিভঙ্গি থেকে। তাহলে সংস্কৃতিগত পার্থক্য যা এল তা গ্রামের জীবনযাত্রা, নৈসর্গিক জীবনচিত্র, যা শহর বা নাগরিক জীবনযাত্রা থেকে আলাদা তো বটেই, সেইসঙ্গে গ্রামের নিজস্ব 'ইমেজ' বা ছবির সঙ্গে সুর বা গানের ভাষাও – এইভাবেই একটা পৃথক পরিসত্তা অনুভব করা যায়। ভাব ও রচনা সম্পর্কে বিশেষভাবে বলা যায় পার্থক্যটা সেখানে ভাষার শৈখিল্যে, আবেগের সরলতায়, উপমার ব্যবহারে সম্পূর্ণ গ্রাম্য পারিপার্শ্বিকতার মধ্যে যা নেহাতই পল্লিগ্রামের নিজস্ব। এটাই লোকসংগীতের পরিমণ্ডল-গূঢ় অর্থে পল্লিগীতি বা

লোকগীতির এই হল স্বকীয় সত্তা। পাঠকরা ভুলবেন না শহরের নিজস্ব পরিগুলোতে যা একসময় চঠিত হত (পাড়া।এলাকা বা পল্লিভিত্তিতে) যেমন সণ্ডের গান, হায় আড়াই, খেমটা (সাংস্কৃতিক মানে যেগুলি নিম্ন) তাও মিশে গেছে পল্লিগানের সঙ্গে, বহিরাবরণ হিসেবেই।

গ্রামাগীতি থেকে পল্লিগীতির উত্তরণে এ ছাড়াও আর-একটি ধাপ রয়েছে যা পল্লিগীতির তাৎপর্য বুঝতে সাহায্য করে। জীবনদর্শনের যে স্বকীয়সত্তা তা এর নিজস্ব সুর ও কথায়, মার্জিত বা অমার্জিত যে রূপেই থাক না কেন, তাকে ‘জাতে তুলছেন', পরবর্তী গবেষকরা, লোকজীবন থেকে উদ্ভূত সংস্কৃতির অঙ্গ হিসেবে তাকে ‘মর্যাদার' আসনে বসিয়েছেন। এ প্রয়োজনটা অনুভূত হয়েছে শহরের মানুষের মধ্যে, তাঁরা সচেতন হয়েছেন আপন জাতীয় সংস্কৃতির শেকড় সন্ধানের তাগিদে। গ্রামের ‘অমার্জিত' সংস্কৃতিরূপকে মার্জিত করে দেখানোর প্রবৃত্তিতে আমদানি করতে হল ‘পল্লি’ কথাটা। গ্রামাগীতি হয়ে দাঁড়াল পল্লিগীতি। জাতীয় সত্তার অনুসন্ধানে যখন স্বাভাবিকভাবেই গ্রামীণ সংস্কৃতির একান্ত প্রয়োজন হল, তখন তার মর্যাদাস্বীকৃত রূপটিকে আনা হল বৃহত্তর লোকসংস্কৃতির আওতায়। লোকসংগীত আখ্যা এল ঠিক এইভাবেই। সামগ্রিক লোকজীবনের মধ্যে পল্লিসংগীত এক বিশেষ মর্যাদা নিয়ে প্রবেশ করল।

লোকশিল্প, লোকসাহিত্য ও লোকসংগীত বলতে আমরা বুঝি মূলত গ্রামের বা শহরের নিরক্ষর মানুষের অভিজ্ঞতালব্ধ শিল্প, সাহিত্য ও সংগীত। অভিজ্ঞতার স্বতঃস্ফূর্ত প্রকাশ ও পুষ্টি ঘটে সুরের কাঠামোয়, আর এ সংগীতের পরিচালিকা শক্তি হল জীবনচর্যারই প্রকরণ, দৈনন্দিন জীবনের নানা কর্ম; দিগ্‌গ্ধারা ও অন্তর্বস্ত একে নিয়ন্ত্রিত করে ; রসদ পারিপার্শ্বিক গাছপালা, পাখি, জন্তু-জানোয়ার, নদীনালা, মানবিক সম্পর্ক, বাদ্যযন্ত্র ব্যবহার্য তৈজসপত্র ইত্যাদি। পরিবেশের অভিজ্ঞতা, পারিপার্শ্বিকতার ইন্দ্রিয়ানুভূত জ্ঞান সম্পূর্ণ প্রাকৃতিক, নৈসর্গিক— আবার সেই সঙ্গে এসে পড়ে আচার-বিচার, ধর্মবিশ্বাস ইত্যাদিও। কবি ও গীতিকার পরিবেশকে উপজীব্য করে তাদের মতো করেই ব্যাখ্যা দেন সহজ-সরল অন্যনিরপেক্ষভাবে। স্বভাবতই সমগ্র দেশকে নজরের সামনে রাখলে এটা বোঝা যায় যে বিশেষ অঞ্চলের সুরের মূল কাঠামো তৈরি হয় তার নিজস্ব ভাষা, প্রাকৃতিক পরিবেশ থেকে তো বটেই সেই সঙ্গে যেটা লক্ষণীয় তার ক্রিয়া কর্ম বা শ্রমের প্রকাশ থেকেও, যেমন— নদীর মাঝিমাল্লার গানে, কাস্তে হাতে চাফির কন্ঠে, মোব-চরানো রাখালের গলায়, ঘরামিদের ছাদ পেটানোর ছন্দগানে।
সমগ্র পৃথিবীর এটা আন্তর্জাতিক চরিত্র। বিশেষ অঞ্চলের বৈচিত্র্য আবার দেশে দেশে আশ্চর্য মিলেরও সৃষ্টি করে, যেমন পাহাড়ের গান, মরুভূমির গান, তরাইয়ের গান— এদের সুরের মিল অদ্ভুত, পার্থক্য শুধু ভাষা ও ধ্বনিগত। ধ্বনিগত তারতম্যের মূল কারণ যে বিশেষ অঞ্চলের সুর কাঠামোর বৈচিত্র্য, সেটা আগে উল্লেখ করেছি। বিশেষ ভাষাভাষী অঞ্চলে বিশেষ সুরের কাঠামো গড়ে ওঠে— এই পশ্চাৎপট ও পরিমণ্ডলই হল লোকসংগীতের বৈশিষ্ট্য। এই পশ্চাদপটকেমনে রেখে সৃজিত হয় তার বিষয়বস্তু ভয়-ভাবনা, প্রেম-ভালোবাসা, আশা আকাঙ্ক্ষা, মিলন-বিরহ, দুঃখ-হতাশা, ব্যঙ্গ-বিদ্রূপ— সব কিছুই বেরিয়ে আসে লোকসংগীতের সৃষ্টি হিসেবে। লোকসংগীতে পশুপাখি, গাছগাছালি, নদনদী, আকাশ বাতাস মায় যাবতীয় খরগেরস্থালির জিনিসপত্র যুক্ত হয় কখনও প্রতীকরূপে, কখনও রূপকে 'আবার কখনও প্রত্যক্ষভাবে। লোকসংগীতে তার পরিমণ্ডল জীবনচর্চার সঙ্গে ওতপ্রোতভাবে জড়িয়ে থাকে। কিছু উদাহরণ দেওয়া যাক : 

পাখি

১. যেই দ্যাশের কুরুয়া তুই,

সেই দ্যাশের সুন্দরী মুক্তিে

নিশাকালে

২. না কান্দিস না কান্দিস রে ভেলোয়া রাতি তোর ভেলোয়ার কান্দন শুনিয়া মন না রয় ঘরে রে ভেলোয়া, কান্দিস ক্যানে ৩. ওকি দৈয়লরে, কার লাগি রাখিবরে সোনার যৈবন.…..

৪. ঘুর ঘুর ঘুর ঘুর ঘুরানি কৈতর উড়িয়া পড়ে মোর চালে মনতে ভাবিয়া দেখাৱে কৈতর

ফান্দিলেন গুনার জালে রে... ৫. উড়িয়া যায় মোর ঘরভরা ডাবতীরে,

চলিয়া যায় মোর বাসরভরা ডাবকীরে ডাবকী চলিয়া গেইলে মন্দির হইবে খালি রে....

গাছগাছালি

১. বটবৃক্ষের ছায়া য্যামন

মোর বন্ধুর মায়া ত্যামন রে.. ২. ও বৃদ্ধ সিমিলারে, গগনে ম্যালে ঠাল, নারী হয়। রসের যৈবন রাইখব কতকালন...
৩. আরে ও মোর বাবার দ্যাশের কুয়ায়া
আজি ক্যানে ডাকিলেন চন্দনবৃক্ষের ডালেরে।

৪. বরাইর গাছে ছাঁচিরে পান,

পইসা দিয়া বন্ধু কিনিয়ারে খান

সাজাইলাম খিলি খাইব্যার আশে,

আও না করে বন্ধু আমার মানের গৈরবে...
৫. ওপারে বান্ধিলাম বাড়ি

গুয়া গাড়িলাম কালা, সারি সারি রে, কলার বাগিচায় ঘিরিল সেইনা বাড়ি রে...

৬. বাড়ির নাময় নাইরকোল গাছটি জল দিব ঘটি ঘটি, একটি নাইরকোল খসাইন গেলে তারে পাঠাব চিঠি.....

৭. বিরানী ধানের ভাজিলাম খৈ, সোনার বন্ধু মোর আসিল্যান কৈ ও মোর রসিয়া— দেখা দাও মোক একবার আসিয়া। জীবজ

১. হস্তীকন্যা হস্তীকন্যা বামুনের নারী মাথায় নিয়া তানকলসি ও সখি হস্তে সোনার ঝারি....

২. ওরে তোমরা মঈব বাতানে রে

মইবাল আমার বাদে কি?

তোমার পেন্দনের শ্যামলাই ধুতি

আমার দাঁতের মিশিরে.... 

৩. শাওলি ববলি গাই, পালের আগু চলে যাই বাগাল ঘুরা, ঘুরারে শাওলি ধরলি দুটি গাইরে, ফল খাইলে মন্দ বইলবে লোকে দিবেক গাইল, রাখাল ঘুরা, ঘুরায়ে..

৪. ওর বিলাই ম্যাও ম্যাও ম্যাও, চিলাই সড়াৎ করিয়া আয় ... 

কীটপতঙ্গ

রে. তোদিন আসিবারে বন্ধু কয়্যা যাও
কীটপতঙ্গ

১. বন্ধু কাজল ভোমরা রে, কোনদিন আসিবারে বন্ধু কয়্যা যাও

করা যাওরে...

2 . আনপোকা আন ফোকা করে।

ভিতরে ফোক ভালো বাইরে,

তেমনি মতো মোর অন্তরে

সখি, কেরে নিল ঘুনে...
মাছ

১. বইল মাছে খেইল করে, ঝরুয়ালি পানির মাঝে
কোমর হ্যাঁকা কোমর ব্যাকা, থেইকোরে থেইকোরে নাচে.....

২. মাছ ধইরেছি সেরুলি পুঁটি বিকতে যাব বাবুর কুঠি 
হাতে নাইকো তোল দাড়ি মাছ কি ওজন করি রে...

৩. মাছের বিয়াও হয়রে তোমরা শুন মন দিয়া শাল দাড়িকার বেটির বিয়া বালিয়া মাছক দিয়া

৪. ওরে ঠেলা জাল, আমি বাইব নদীর কিনারে, যদি হত গড়ই শোল লাগাই দিত গণ্ডগোল হে ওই পুঁটিমাছ দাঁড়কিনা বিকাইন গেইল বাজারে

নদনদী

১. গদাধরের পারে পারে রে মোর মাউতে চরায় হাতি কি মায়া নাগাইল্যান মাহুত রে তোর গালায় রসের কাটি....

২. তোরসা নদীর উতাল পাতাল কার বা চলে নাও নারীর মন মোর উতাল পাতাল কার বা চলে নাও...

ফুল
১. জলে পদ্ম, স্থলে পদ্ম কোন পদ্মেতে মধু

আছে গো

কালো ভ্রমর জ্ঞানী ফুলের মর্ম 
সখি গোবরা  পোকায় জানে না ।
এমন ভাবের নদীতে সইগো ডুব দিলাম না।

2. কুরচি ফুল করছি ফুল আগে আগ লো
বিটি ছাইয়ার দূরে বিহা খাঞ্জে অন্তর  লো......
স্থান

১. ঝিকো ঝিকো কড়িরে আঞ্চলে বান্ধিয়া রে যায় নীলমন গৌরীপুরের হাটরে নীলমন নীলাইও না...

২. যেদিন গাড়িয়াল উজান যায় নারীর মন মোর ঝুরিয়া রয় রে হাঁকাও গাড়ি তুই চিলমারীর বন্দরে রে...

৩. শালমারার তলেরে তলে মুঞি নারী যাওং জলে সই

শালমারার বনের পঙ্খী কান্দে হায়রে হায়... 

৪. কাল বিয়ানে রংপুর যাব কিনিয়ারে আবন ছায়মানা

ওরে জল পড়ি ভিজিল নারে বিছিনা.…...

সুগন্ধি দ্রব্য

১. সোদা ভাজে সোহাগিনী নিশাভাব রাতি সেই সোন্দার বাস গেইল রাঙামাটির ভাটি....

২. নাইরল তেল আনছিল বন্ধে ঘুমো দেখি দিল না ঘুম ঘুম করে লো ঘুমে মোরে ছাড়ে না।

বাদ্যযন্ত্র

১. ঢোল ধামসা পড়ে রইল। মালির বাগানে,

বায়েন দাদা ঘুমাইন গেইছে গো ও তার নব যৈবনে.....

২. আরে ও মোর কাঠলকোটার ওরে দোতরা তুই মোক গানাইলু জনমের বাউদিয়া রে...
৩. ভাল্ করিয়া বাজান রে দোতরা,

কমলা সুন্দরী নাচে

.ভাল্ করিয়া বাজান রে ঢাকুয়া,

কমলা সুন্দরী নাচে

ভাল্ করিয়া বাজান রে বাশিয়া

কমলা সুন্দরী নাচে

৪. মোর পায়ে বা ঘুড়রা বাজেরে

মুঞি ক্যামনে বাইরা যাওং...
৫. বাইজ আইনচেন ধেরেৎ ধেরেত্ শানাই সরুয়ালি গালা ও নেদেয়া সে ফেলেয়া দেওং গুড়িয়া সে ফেলেয়া দেওং দয়ার বাবার আগে ও।..

চিত্রকল্প ও শব্দবাঙ্কার

১. নৌদানিটা মরিয়া মোর যে হইচে হানি আঁধার ঘরত পড়িয়া থাকোং পড়ে চউকের পানি আরো টামুস কি টুগ্গস করিয়া, নদীর কাছাড়ের মতন ভাঙিয়া নামায় বুক ওকি হারাম কি হুরুম করিয়া, তোলা আছে ঢাকাই শাড়ি কায় যাবে পিন্দিয়া ওকি খসর কি মসর করিয়া মোর নৌদানি থাকিল হয়, বগলতে বসিল হয় মাছ কুটিল হয় ঘেঁচ্চোৎ কি যোচ্চোৎ করিয়া

২. নাচইন বালা সুন্দরীয়ে পিন্দইন ভালা নেতৃ হেলিয়া দুলিয়া পড়ে সুন্দিজালির বেড ভালা নাচতো দেখি......

মেঘ

১. কালো মেঘে সাজ কইরাছে পরাণ মানে না সাবধানে চালাইও তরী নাও যেন ডুবে না বা নাইয়া, নদীর কূল পাইলাম না..

2 .  মেঘ কইরেছে ঢাকা চাকা
ই মেঘে কি জল হবে, 
বাইদের গুছি  বাইদে থাইকলো
আর কি ভাদুর চাষ হবে....
৩. রূপ দেখোঁ তোর সরিষার ফুলরে কইন্যা

যৌবন যায়রে ভাটি

হাড়িয়া মেঘ যেমন মাথার চুলরে কইন্যা

আমার পরাণ নিলেন হরিয়ারে কইন্যা

নৌকায় চড়ো।
লোকসংগীতে পারিপার্শ্বিক কীভাবে ওতপ্রোত জড়িয়ে থাকে তার সামান্য কয়েকটি উদাহরণ এখানে দিলাম। বাকি থেকে গেল আচার-অনুষ্ঠান, সমাজের বিভিন্ন পেশার এবং স্তরের মানুষ, বিয়ে, ব্যবহার্য যাবতীয় তৈজসপত্র ইত্যাদি অনেক অনুষঙ্গ— যা নিয়ে লোকসংগীতের পরিমণ্ডল।

কালের হিসেবে ‘গণসংগীত' এসেছে অনেক পরে, ইতিহাসের অনিবার্য গতিতে। মূলত দেশপ্রেম, সমাজচেতনা, প্রতিবাদ ইত্যাদি প্রকাশের উদ্দেশ্যে এক ধরনের সংগীতের সৃষ্টি হল— গণচেতনার আদর্শ যার মূল পটভূমি— এই সংগীতকে বলা হয় ‘গণসংগীত'। এর আবির্ভাব, রচনা ও সৃষ্টি মূলত শহরে, শিক্ষিত সমাজের দ্বারা। গণসংগীতের ব্যবহার জনগণের ব্যাপকতর অংশের কাছে কোনও বিশেষ আদর্শ পৌঁছে দেওয়ার উদ্দেশ্যে। এটা করতে গিয়ে গণসংগীত যখন গ্রামের সুরকে ব্যবহার করে, তখন একটা বিভ্রান্তি জন্মায় সাধারণ মধ্যবিত্ত শ্রোতাদের মধ্যে, তারা পরিসংগীত তথা লোকসংগীতের সঙ্গে গণসংগীতের আদলটাকে গুলিয়ে ফেলেন। বস্তুত প্রকাশ ভঙ্গিতেই দুয়ের মধ্যে অমিল আছে, বিষয়বস্তুতে তো বটেই।

এ ছাড়াও একটি বড় পার্থক্য আছে। গ্রামের মানুষ যখন উপরিউক্ত বিষয়গুলি নিয়ে গান ‘বাঁধেন' তখন স্বাভাবিকভাবেই তাঁরা গ্রামীণ কাঠামো, সুর ইত্যাদি ব্যবহার করেন, কিন্তু অনিবার্যভাবেই তাদের হয় ভাব, নয় ভাষা বা দুই-ই পরিশীলিত শহরে দৃষ্টিভঙ্গির দ্বারা চালিত হয়। এবং সেখানেই তাদের উভয়ের মধ্যে একটা পার্থক্য বা ব্যবধান রয়ে যায়। শহরের লোক রচনা করে বা 'লেখে', গ্রামের লোক রচনা করে না, ভাঙা গান "বাঁধে। স্বভাবতই লিখিত রচনার ক্ষেত্রে যে শিক্ষিত মস্তিষ্কচালন, তা কৃত্রিমতার সৃষ্টি করে, অথচ মুখে মুখে "বাঁধা" গানে থাকে সহজ অকৃত্রিম গ্রামীণ স্বতঃস্ফূর্ততা। বহিরাবরণ ও অন্তর্বর পারস্পরিক সম্পর্কে তাই দুটি আলাদা ভাবক্ষেত্র, যা সহজে এক করা সম্ভব নয়। এদের রূপকারও তাই আলাদা। কেন, সে বিষয়ে পরে আসছি।

স্বদেশি আনল বাবরিনযুগ থেকে (বন্দেমাতরন ইতাদি কয়েকটি গান ছাড়া, যেখানে বিবাবের প্রার্থীত মানেই হোক বা শহরেই হোক, সহজবোধ্য বা দুর্বোধ্য হলেও) বেশি জনের মারফত স্বাধীনতার জেরটা ব্যাপকভাবে সাধারণ্যে সঞ্চায়িত হয়েছিল সরা, কিন্তু মানুষের মধ্যে চালু হয় নি, অর্থাৎ তার নিজস্ব কথা গান বা ভঙ্গিতে প্রকাশ পায় নি। অবশ্য যাত্রা গানের প্রভাবে কবি মুকুন্দ দাস প্রভৃতি মারফত কিছু গান বৃহত্তর ক্ষেত্রে ছড়িয়ে পড়েছিল, কিন্তু পরবর্তীকালে তা ওই পর্যন্তই সীমাবদ্ধ থেকে যায়। নতুন কোন সৃষ্টি বা পরিপুষ্টি ঘটেনি। গণসংগীত কথাটা এল তারপরে যখন যুদ্ধ এলো, দুর্ভিক্ষ, কালোবাজারি এল, স্বাধীনতা আন্দোলন ও তাঁর সঙ্গে যুক্ত হলো শহর-গ্রাম নির্বিচারে সেই সভায় সর্বসাধারণের জন্য যে গানগুলি রচনা করা হল, তার রচয়িতা শিক্ষিত মানুষ। তাদের বিষয়বস্তু রাজনৈতিক চেতনা দ্বারা সংপৃক্ত, কমিউনিস্ট চেতনা, স্বাধীনতা-চেতনা যার মূলীভূত ; রচনার মধ্যে যদিও সব জাতীয় সুরই ব্যবহৃত হয়েছে, উচ্চাঙ্গ থেকে শুরু করে উপজাতিক সুর পর্যন্ত — কিন্তু মজার ব্যাপার এই যে এদের আবেদন সীমাবদ্ধ থাকল মধ্যবিত্তের মধ্যেই। নিজের অভিজ্ঞতায় বলছি। নিজে মাঠে-ঘাটে গান গেয়ে শুনিয়ে লক্ষ্য করেছি গ্রামের মানুষদের মধ্যে তার কোনও প্রতিক্রিয়া তো হয়ই নি, বরং অনেক ক্ষেত্রে বিরূপ প্রতিক্রিয়াও হয়েছে।

দোষ তাদের নয়। স্থান-কাল-পাত্র ভেদ না বুঝেই আমরা এমন গান গেয়ে অনেক সময় ভুল করেছি। উদাহরণ দিই— দুর্ভিক্ষের সময় সিলেটের এক গ্রামে আমি একটা হিন্দি গান গেয়েছিলাম। গানটির প্রথম লাইন ছিল— 'ভুখা হ্যায় বাঙ্গাল রে সাথী ভূখা হ্যায় বাঙ্গাল'। সিলেটের গ্রামের লোকের কাছে হিন্দিটা ‘গ্রিকের’ চেয়েও দুর্বোধ্য। তাই গানের শেষে একজন চাষি আর একজন চাষিকে জিজ্ঞেস করলে, কী বুঝলে, কিছু বুঝতে পারলে?' জবাবে অন্যজন বললে, 'ও তো হিন্দি গাইল, কইল, বাঙ্গালরা বুকা (বোকা)।' সিলেটে ধ্বনিগতভাবে 'ব' আর 'ভ', ও-কার আর উ-কার, প্রায় সমান। আরও মজার কথা, সিলেটের সাধারণ লব্‌জে বাঙ্গাল=মুসলমান; অর্থাৎ ‘বাঙালিরা অভুক্ত' কথাটা দাঁড়িয়ে গেল 'মুসলমান বোকা'। আমার দীর্ঘদিনের সংগীত সংগ্রহের অভিজ্ঞতায় দেখেছি, দরিদ্রের প্রতি শত সহানুভূতি সত্ত্বেও তাদের সম্পর্কে লিখতে গিয়ে যেভাবে লেখা হয়েছে, চাষিরা ওভাবে নিজেদের দারিদ্র্য বা সহানুভূতির কথা বলে না, তাদের প্রকাশভঙ্গি ভিন্ন। যেমন গণনাট্য সংঘের বিনয় রায় রংপুরের একটা বিখ্যাত 'চটকা'র সুরে গান করলেন:

‘গরিব দেশবাসী, গরিব কিসান ভাই খেতত্ করলিরে ফসল,

সেই ফসল কাড়িয়া নিল মজুতদার বাটপাড়ে' ইত্যাদি।

মূল যে গানটির সুরে এ গান লেখা হল সেটি ড্যাভর বঁধুয়া তুই ড্যাঙর বঁধুয়া তুই খোয়াবার খাইবার) চাকু'রে
কইতর (কবুতর)
 সেই কইতর আনিয়া দিলু আইত
 নিশাকালরে......
কইতর নাড়ান,কইতর চাড়ন
 কইতরের নাইরে পরিয়্যা (পালক)
[09:12, 04/03/2022] Nilanjan: পিদিম জ্বালাইয়া দেখি দাঁড় কাউয়ার

বাচ্চারে... ইত্যাদি

অর্থাৎ এখানে গানের বিষয়বস্তু ছিল একজন প্রায়াদ্ধ বুড়োর দ্বিতীয় পক্ষের স্ত্রীর কাছে কবুতর খেতে চাওয়া এবং সে যা চাইছে তার স্ত্রী তাকে অন্য জিনিস দিয়ে প্রতারণা করেছে। প্রতারণার বিষয়টি দারিদ্র্যের ধোঁকা বা বঞ্চনা।

বিনয় রায়ের গানটি একজন পল্লিগায়ককে গেয়ে শোনাতে বললে সে প্রথম দিকে পরিচিত সুরে আকৃষ্ট হলেও যেই দেখল তার ভাষা অন্য, তখন সে আর সে গান গাইতে চাইল না। চাষিদের চরিত্র হল যখন তারা কোনও গান ভালোবাসে তখন তারা সঙ্গে সঙ্গেই মুখে মুখে সে গান তুলে নেয়, হয়তো প্রয়োজনমতো কথাও একটু আধটু পাল্‌টে নেয়। মোটামুটি মূলটা ঠিক থাকলেই হল। মৌখিক রচনার এই বৈশিষ্ট্য। বিনয় রায়ের শত সদিচ্ছা সত্ত্বেও আমি এ গান আর কাউকে গাইতে শুনি নি। এমনি আরও অনেক উদাহরণ দেওয়া যায়। দারিদ্র্য দূরীকরণের জন্য ছোটোখাটো দল থেকে শুরু করে দেশের প্রধানমন্ত্রী পর্যন্ত সবাই ব্যগ্র। কিন্তু দারিদ্র্য প্রকাশ করতে গেলে চাষিরা অন্যভাবে তা প্রকাশ করে। যেমন উত্তরবঙ্গে জলপাইগুড়ির একটা গণ:

ওকি হন মোর মজিরা গেল নাফা রে একি চিত্ মোর মজিয়া গেল নাফা রে নাফা নাকা হামারে মোর ধাপা ধাপা পাত সেই নাফা রাখিয়া না মুই গুদায় মানু ভাতরে। নাফা শাগ রাখিনু মুই হোরাং ফোরোং সেই নাফার বালেনা গেল উত্তোরপাড়া ওটকি মাছ আর নাকারে দুই আরো যদি পাও দ্যায় সের চাউলের ভাত রাখিয়া মুই দিবেয়া খাও।।
    এই গানে 'নাফা' নামে যে শাকের বর্ণনা আছে, তা অতি তুচ্ছ এবং নিকৃষ্টমানের। অত্যন্ত দরিদ্র লোকের খাবার এটা ।কিন্তু তাকে ইচ্ছে করে মহনিয় করা হলো এইভাবে ।নাপা শাক দেখেই আমার মন এবং চিত্ত  মজে গেছে। যে নাপা শাক ঝোপা এবং বড় বড় পাতা সেই নাফা রেঁধে আমি খালি খালি ভাত খেয়ে ফেলি। নাফা রাধলুম আমি সর্ষে ফড়োং  দিয়ে,  সেই নাফার সুগন্ধি ছড়িয়ে গেল উত্তরপাড়া দিয়ে।
নাফার সঙ্গে যদি একটুখানি ঔটকি মাছ পাই তা হলে দেড় দের চালের ভাত আমি প্রাণভরে খেতে পারি। এ শাক যে চরম দারিদ্র্যের প্রতীক মাত্র তা সোজাসুজি উল্লেখ
করা হল না।

বাঁকুড়ার উদাহরণ—

- ওগো কিসে বাঁচে

সাঝে খাইয়ে তোর বিহানির টান

খাওয়া দাওয়া সইরেগো পড়িল

আঁধার রাইতে দুটো কুটুম গো আইল,

জলঘটিটো নামাই দিয়ে

(ও যেন তোর) দাঁড়াই অপমান। 

     এটি একটি ঝুমুর গান। কি করে প্রাণ বাঁচে, সন্ধের আগেই যা কিছু ঘরে ছিল তাই খেয়ে পরদিন সকালের ভাবনা— কী যাবে। খেয়ে দেয়ে শুয়ে পড়েছে। আবার রাতে দুজন কুটুম এসে হাজির। অতিথিকে পা ধোয়ার জলের ঘাটিটি এগিয়ে দিয়ে অপমানিত বোধ করছে আপ্যায়নের কোনও কিছুই ঘরে নেই বলে। অনেক কথাই গানের দুটো লাইনের ফাঁকে আছে অনেকটা জাপানি হাইকুর মতো। প্রকাশের সংযমই হল লোকসংগীতের প্রাণ, দারিদ্রের উল্লেখ নেই অথচ সামান্য করে সবই প্রকাশিত। আর-একটি উদাহরণ :

যার কাপড় তার জাড় 

লিকাপড়ার পাথর আড় 

লি-কাপড়া রইল নিশি ভেইগো। 

          অর্থাৎ যার যথেষ্ট কাপড় আছে তার গায়েই যত শীত। যার কাপড় নেই তার পাথরের আড়ালই একমাত্র সম্বল। কাপড়হীনের রাত কাটে জেগে থেকে। ক্ষোভ বা প্রতিবাদ বলতে যা কিছু তা এই সোচ্চার বলতেও এইটুকুই। বাঁকুড়ার আর একটি উদাহরণ দেওয়া প্রয়োজন বোধ করছি। এ জাতীয় গনকে বলে 'লাইলা"। পথ চলার পরিশ্রম লাঘব করার জন্য এ জাতীয় গান গাওয়া হয় তক্ষুনি বানিয়ে বানিয়ে গান চলতে থাকে চাপান-উতোর হিসেবে
প্রথমজন

আমার দেশের মুশুরিকা

ডাইল

আমার দেশের মুশুরিকা ডাইল রে

আমার দেশের।

ওরে আমার খাইয়ে দাইয়ে—
মনরে পান (প্রাণ) আমার

পান আমার পিয়ারি

খাইতো দিব হরিবোল বিড়ি ইত্যাদি।

জবাবে দ্বিতীয়জন বলছে

গিইছিলুম হে তোদের ঘর

মিন বাসাতে (বিনা বাতাসে) হাঁড়ি লড়ে

তোর হে

মিন বাসাতে।

এই গানে প্রথমজন তার নিজের অঞ্চলে যে মুগুরির ডাল হয়, সেই কথা জানিয়ে

ভালো খাওয়া দাওয়ার লোভ দেখায় এবং শেষে 'হরিবোল' বিড়ি দেবে সে আশ্বাসও জবাবে দ্বিতীয়জন— তোদের বাড়ি গিয়ে দেখলাম বিনা বাতাসে হাঁড়িটি দুলছে।

দেয়।

প্রথমজনের হাঁড়িতে যে চালই নেই সে কথা ইঙ্গিতে জানাল, কিছুতেই স্থূলভাবে

প্রকাশ করল না।

সদিচ্ছা থাকলেও যে অনেক গান মানুষের কাছে পৌঁছয় না বা গ্রামের মানুষের কাছে গ্রহণযোগ্য হয় না আরও কিছু উদাহরণ দিচ্ছি

রবীন্দ্রনাথ লিখেলেন

আয়রে মোরা ফসল কাটি,

মাঠ আমাদের মিতা— ইত্যাদি। ভারতের গণনাট্য সংঘের উজ্জ্বল জ্যোতি জ্যোতিরিন্দ্র মৈত্র লিখলেন,

এস ধান কাটি ফসল কাটি কাস্তেতে দিই শান

কাছে মোদের মিতারে ভাই...

কাস্তে মোনের জান

সলিল চৌধুরি লিখলেন,

হেই সামালো ধান হো
কাস্তেটা দাও সায়াহ্ন জান কবুল আরমান কবুল ইত্যাদি

হেমাঙ্গ বিশ্বাস লিখলেন

কাস্তেটারে দিও জোরে শান কিসাণ ভাইরে .....ইত্যাদি।
এই চারটি গানের একটি গানও কোন চাষকে আমরা গাড়িতে শুনিনি (অনুরোধ করা সত্ত্বেও)। যেমন, যে নাফা শাকের গানটি গেয়েছিল তাকে অনুরোধ করেছিলাম সমসাময়িক ঘটনা নিয়ে কোনও গান সে জানে কি-না। প্রথমে সে চুপ করে থাকল। বললাম, অমুক তো এ গানগুলি গায়, তখন তার জবাব হল— ভিতর থেকে না আসিলে কী গাই বাবু? আর ভারতবর্ষের সমস্ত রকমের রাজনৈতিক দল বা উপদল তাদের মঞ্চ বা বেতার-বক্তৃতায় যতই ‘ভাই (ভদ্রমহোদয় ও ভদ্রমহিলাগণ, মজনুর ও চাষি ভায়েরা) কথাটা সম্বোধনে উচ্চারণ করুন, চাষিরা এ সম্বোধনের কৃত্রিমতাটুকু সহজেই ধরে ফেলে, তাদের মনে এতটুকু সাড়া জাগায় না।

আসল কথা, চালু গণসংগীতগুলো মূলত সাময়িক সমস্যাভিত্তিক, সুতরাং সমাধান হয়ে পড়া বা অপ্রয়োজনীয় হয়ে পড়ার সঙ্গে সঙ্গে তা শেষ হয়ে যায়। অনেক রসোত্তীর্ণ শিল্পকুশল গানও তাই সমসাময়িকতার 'বলি' হয়। গণসংগীতের ধারক ও বাহকদের ধারণায় এ গানগুলো যতই জনপ্রিয় মনে হোক না কেন, এদের আবেদন ও জনপ্রিয়তা সীমাবদ্ধ ; বিশেষ বিশেষ রাজনৈতিক গোষ্ঠীর স্বকীয় গণ্ডীর মধ্যেই আবদ্ধ।

আগেই বলা হয়েছে, গণসংগীতের সুরের কাঠামো ব্যাপক, তা উচ্চাঙ্গ থেকে শুরু করে উপজাতিভিত্তিক অবধি হতে পারে। কাজেই যখন লোকসংগীতের ওপর ভিত্তি করে কোনও গান গাওয়া হয়, তখন সাধারণের ধারণায় গণসংগীত ও লোকসংগীত সমার্থক হয়ে দাঁড়ায়। কিন্তু এটা যে একটা বিভ্রান্তিমার তা বোঝা যায় সঠিক যাচাই করলে, যেমন জ্যোতিরিন্দ্র মৈত্রের 'নবজীবনের গান', এগুলি লোকসংগীত নির্ভর নয়, তার বেশিরভাগই মার্গসংগীত-নির্ভর। সলিল চৌধুরির গানও তাই, বরং কিছুটা লোক এবং অনেকটা পাশ্চাত্য রীতি অনুযায়ী রচিত। অন্যদিকে হেমাঙ্গ বিশ্বাসের বেশিরভাগ গানই হুবহু লোকসংগীতের সুরে বসানো। এ সবটাই কিন্তু গণসংগীতের আওতায়। কিন্তু এদের বিষয়বস্তু সীমাবদ্ধ। লোকসংগীতের একটা চিরন্তন আবেদন আছে, তার কাঠামোগত সীমাবদ্ধতা সত্ত্বেও— আবার গণসংগীতের শত সুর-বৈচিত্র্য সত্ত্বেও তাৎক্ষণিক সমস্যানির্ভর বলে তা চিরন্তন হতে পারে না, তার আয়ু সীমিত।

প্রসঙ্গত উল্লেখযোগ্য, গুরুসদয় দত্ত সে আমলে এ জাতীয় সংগীতের নামকরণে ‘গণ'নামটাই ব্যবহার করেছিলেন; অর্থাৎ লোকসংগীত প্রজাতির যে কোনও গানকেই ‘পণ' আখ্যা দিয়েছিলেন, তাঁর সংগৃহীত পরিসংগীতও এর আওতায় পড়ে— জনগণ যা যায়। তাই গণসংগীতে এই ব্যাপক সাধারণ অর্থে। 
  এবার প্রশ্ন হল গণসংগীত এবং লোকসংগীত আমাদের জীবনে, বিশেষত নগর জীবনে কতটা প্রাসঙ্গিক ।যেহেতু গণসংগীত প্রসঙ্গ নির্ভর তাই প্রাসঙ্গিক তবে অবশ্যই নয় আর লোকসংগীত কতটা প্রাসঙ্গিক গ্রামীণ জীবন চর্চা প্রকৃতিনির্ভর অন্যদিকে নগরজীবন যন্ত্রনির্ভর গ্রামীণ সংস্কৃতি যেমন প্রাকৃতিক পরিবেশ দ্বারা নিয়ন্ত্রিত তেমনি নাগরিক সংস্কৃতি বা জীবনচর্চা যন্ত্র দ্বারা নিয়ন্ত্রিত পার্থক্য অথবা ব্যবধান প্রকট হয় তখনই যখন দুই জীবনচর্যা একটা চূড়ান্ত জায়গায় গিয়ে পৌঁছয়, দুই জীবনচর্যার মধ্যে অপরিচিতের বেড়া তৈরি হয়, যা পশ্চিমে অনেক শিল্পোন্নত দেশের ক্ষেত্রে প্রযোজ্য, সেখানে লোকসংগীত গবেষণার বিষয়, জাদুঘরের বস্তুতে পরিণত। আমাদের দেশে সে অবস্থা এখনও তৈরি হয় নি, নগরজীবন যথেষ্ট শিল্পায়িত হয় নি, এখনও গ্রামের সঙ্গে অধিকাংশ মানুষের যোগাযোগ রয়েছে। আমাদের নগরজীবন এখনও লোকসংস্কৃতি দ্বারা প্রভাবিত। আমাদের উচ্চাঙ্গ সংগীতশিল্পীরা লোকসংগীতের সঙ্গে সেতুবন্ধনের চেষ্টা করছেন। শহরে শিল্পীদের দ্বারা যত বিকৃত লোকসংগীতই পরিবেশিত হোক, তবু লোকসংগীত নাগরিক সংস্কৃতির একটা প্রয়োজনীয় অঙ্গ হিসেবে গণ্য।

লোকজীবন থেকে বিচ্ছিন্ন মানুষেরা এখনও লোকসংগীতে নাড়ির টান অনুভব করেন, অনেক অনুষঙ্গ খুঁজে পান, তাই লোকসংগীত আমাদের নগরজীবনেও অপরিহার্য ও দারুণভাবে প্রাসঙ্গিক। আর এই প্রাসঙ্গিকতা আমাদের জীবনে আরও বহু বহু দিন অব্যাহত থাকবে কালপ্রবাহের সঙ্গে।

শারদীয় আজকাল ১৯৯৪
 

Comments

HSKVPAVOPU105202271321