| | | | | |

সুরসৃষ্টি সম্পর্কে | Suroshristir Somporke

by সলিল চৌধুরি | Salil Chowdhury
সুরসৃষ্টি সম্পর্কে | Suroshristir Somporke

অনেক উৎসাহী বন্ধু আমাকে প্রশ্ন করেছেন -গানের সুর দেবার কায়দাটা কি ?কেউ কেউ জানতে চেয়েছেন, আমি যখন কোন গান তৈরি করি আগে তার সুর আসেনা, কথা আসে। কিছু কিছু উৎসাহী বন্ধুর চিঠি আমি মাঝে মাঝে পেয়ে থাকি । তাদের মধ্যে কেউ কেউ সমাজদার শ্রোতা ,কেউ তরুণ সুরকার, কেউবা গীতিকার ,এরা নানা সময় নানা রকম প্রশ্ন করে থাকেন ,গানে সুর দেওয়া কাউকে শেখানো যায় কিনা ? ওটা কি জন্মগত প্রতিভা? একজন লিখেছেন এবার আপনি স্বাধীনতার প্রতিকার সম্পাদকীয় প্রায় সুর লাগিয়ে দিন মনে হয় আপনার পক্ষে সম্ভব । আবার কেউ কেউ আমার শুভাকাঙ্ক্ষী সমালোচক আপনার গানে ভীষণ ইংরেজি সুর এসে পড়েছে , আপনার সুর একঘেয়ে হচ্ছে, >আপনার ক্লাসিকাল সঙ্গীত শেখা উচিত ইত্যাদি তারা লিখে থাকেন। এই সবকিছু মিলে নিজস্ব সুর সৃষ্টি সম্পর্কে আমার নিজস্ব ধারণা গড়ে তোলার প্রয়োজনীয়তার মাঝে ম>াঝে উপলব্ধি করেছি । অবশ্য সুর সৃষ্টি করা সম্পর্কে প্রবন্ধ লেখার চেয়ে সুর সৃষ্টি করা এর বেশী আনন্দদায়ক । আসল কথা সুর সৃষ্টি করার সময় কি করে তৈরি হলো তার বৈজ্ঞানিক প্রক্রিয়াটি কি এই সম্বন্ধে ভাবার কোন অবকাশ থাকে না সে যাক সুর সৃষ্টি সম্পর্কে কিছু ধারনা আমার মনে জন্মেছে সেটা জন্মেছে আমার নিজস্ব অভিজ্ঞতার ভিত্তিতে সেটাই যে অবধারিত সত্য এমন কথা বলছিনে তবু একজনের অভিজ্ঞতা আর একজনকে সাহায্য করতে পারে। বিশেষ করে তরুণ সুরকারদের এই ভাবেই এই প্রবন্ধের অবতারণা করছি।

 

ওপরের কোনও প্রশ্নের জবাবের মধ্যে না গিয়ে সুরসৃষ্টি সম্পর্কে আমরা মোটামুটি ধারণা ব্যক্ত করার  চেষ্টা করব, তার মধ্যে সব প্রশ্নের কিছু কিছু জবাব পাওয়া যাবে।

 

কবি যখন কবিতা লেখেন তিনি কি করেন?  তার অন্তরের ভাব প্রকাশ করার জন্য সাধারণত ব্যবহৃত শব্দ গুলোকে এমনভাবে সাজান যাতে দৈনন্দিন জীবনের খুঁটিনাটি সাধারণ কথাগুলো ছন্দে এবং সংগীতে অসাধারণ রূপ ধারণ করে । অর্থাৎ আমি বলতে চাচ্ছি কবি কবিতা লেখার জন্য ভাষা সৃষ্টি করতে হয়না , প্রত্যেক ভাষারই প্রত্যেকটি শব্দ সেই ভাষাভাষী মানুষের মনে একটি বিশেষ ভাবে সৃষ্টি করে। কবি সেই মৃত অবস্থাকে অনুকূলে পান বলেই কবিতা সৃষ্টি করতে পারেন,একথা বলাই বাহুল্য। শুধু কবিতা কেন, আমি যা লিখছি, এর প্রত্যেকটি শব্দের একটি বিশেষ অর্থ এবং ভাব যদি না বাঙালির কাছে থাকত আমি যতই কায়দা করে শব্দগুলো সাব্বাই না কেন, এর কোনও অর্থই আপনাদের হৃদয়ঙ্গম হত না।

 

সংগীতের সঙ্গে কবিতার অনেক তফাত থাকলেও প্রায় একইভাবে একথা বলা যায় যে সুরকার যখন সুর সৃষ্টি করেন তখন তিনি একটি বিশিষ্ট জাতীয় মানুষের মনে গৃহীত শব্দ (sound) গুলিকে ছন্দে এবং সংগীতে সাজান মাত্র। বিশিষ্ট জাতীয় বলছি এই জন্য যে ভাষার মতো সংগীতের স্বরসমষ্টিও একটি বিশেষ ভৌগোলিক এবং সামাজিক পরিবেশের মানুষের মধ্যে বিশিষ্টভাবে গড়ে ওঠে যা অন্য কোনও পরিবেশের সংগীত থেকে স্বতন্ত্র্য্য। এই জন্যেই ভারতীয় সংগীত বিশিষ্টতায় ইউরোপীয় সংগীত থেকে ভিন্ন। ভারতীয় সংগীতের মধ্যে আবার দক্ষিণ ভারতের সংগীত উত্তর ভারতের সংগীত থেকে বিশিষ্টভাবে স্বতন্ত্র। তেমন বাংলার লোকসংগীত আবার বিহারের লোকসংগীত থেকে বিশিষ্ট। কিন্তু একটি কথা মনে রাখতে হবে যে সংগীত জীবন্ত এবং জীবন্ত বলেই পরিবর্তনশীল। মানুষের অগ্রগতির সাথে সাথে নতুন শব্দ (sound), নতুন ভাবধারা, নতুন জীবনযাত্রার প্রভাব সংগীতে পড়বেই। যাঁরা কোনও সংগীতের 'অব্যয় 'তায় বিশ্বাস করেন তাঁরা ভুল করেন এবং সংরক্ষণশীল প্রতিক্রিয়াকে সাহায্য করেন।

 

মানুষের মনে শব্দ সম্বন্ধে অনুভূতিটা জন্মায় কোথা থেকে? নিশ্চয় আকাশ থেকে পড়ে না! বস্তুজগতে আদিমকাল থেকে আজ পর্যন্ত যে বিচিত্র শব্দসম্ভার ধ্বনিত হচ্ছে– বজ্রাঘাত, ঝড়, বৃষ্টি, পশুর ডাক, পাখির কাকলি, যৌথভাবে শিকার করা থেকে আরম্ভ করে নৌকা বাওয়া, বীজ বোনা, বহন করা ইত্যাদির শব্দ, আজকের যুগে কারখানার শব্দ, ট্রেনের ছন্দ, জাহাজের ভোঁ, ট্রামের ঘড়ঘড়, প্লেনের শব্দ, নিস্তব্ধ দুপুরে ফিরিওয়ালার চিৎকার, দুর্ভিক্ষপীড়িত বাঙলার 'মা ফ্যান দাও' এই সবই কিন্তু সংগীতের উৎস। যাঁরা বিখ্যাত রাশিয়ান সুরকার মুসোগৃদ্ধির জীবনচিত্র দেখেছেন, তাঁরা জানেন, মুসোগঞ্জি তাঁর একটি বিখ্যাত symphony তৈরি করেছিলেন একটি দৃশ্য দেখে এবং শব্দ শুনে : এক অত্যাচারী জমিদার একটি চাবির ছেলেকে চাবুক মারছিল, স্পাৎপাৎ শব্দের সঙ্গে সঙ্গে ছেলেটির মুখ থেকে আর্তনাদ বেরিয়ে আসছিল, এটিকেই theime করে তিনি তাঁর symphony তৈরি করেন। বস্তুজগতের শব্দসম্ভার এর প্রতিক্রিয়া সঙ্গীতে ভাবজগতের সৃষ্টি করে । কিন্তু এটাও সত্যি যে মানুষ এভাবে জগতের পাচকরসে আবার নতুন শব্দ সম্ভার জন্মগ্রহণ করে ; সেই শব্দে সংগীত আবার বস্তুজগতকে স্বর্গীয় করে তোলে এটাই সমাজে সুরকারের ভূমিকা 3 হাজার বছর আগে কোন তপবনের ঋষির মনে বস্তুজগতের শব্দসম্ভার এর প্রতিক্রিয়ায় যেভাবে জগতের সঙ্গে জন্মানো সম্ভব ছিল (হয়তো তা শুধু ওস্তার ধ্বনিমাত্র) আজকের কোনও চিন্তাশীল সুরকার যদি সেইটাকেই একমাত্র পরিত্র সংগীত বলে মনে করেন, তিনি ভুল করবেন। তাঁর সংগীতে বিগত তিন হাজার বছরের শব্দসম্ভারের অভিজ্ঞতা অজ্ঞাতসারে হলেও যুক্ত হচ্ছে এবং এইটাই হওয়া স্বাভাবিক।

 

এটা ঠিক, আমি যখন সুর করি, এসব কথা ভেবে করি না। কিন্তু আমি মনে-প্রাণে আমার বিষয়বস্তুর প্রতি আন্তরিক হতে চাই। কোনও কথাকে প্রকাশ করবার সময় কোনও সুরের আমি যখন আশ্রয় নিই আমি মনে-প্রাণে বিশ্বাস করি যে আমার দ্বারা এই কথাটি ওইভাবে বলা ছাড়া অন্য কোনোভাবে বলা সম্ভব নয়। জোর করে কোনও রাগরূপের নিয়ম-কানুন মেনে চলা হয়তো সম্ভব কিন্তু আমার আন্তরিকতায় বাধে। মনে করুন, সুকান্তের 'অবাক পৃথিবী অবাক করলে তুমি’ এই কবিতাটিতে সুর দেওয়ার আগে অন্তত কয়েকশত বার আমি সুর করে কবিতাটি আবৃত্তি করেছি, আবৃত্তি করতে করতে হারমনিয়ামের কয়েকটি পর্দা আপনা থেকেই এসে গেছে। তখন লক্ষ্য করে দেখেছি প্রথমাংশে ভৈরবী সুরের প্রভাব এসেছে। কিন্তু মাঝখানে যেখানে 'অবাক পৃথিবী অবাক যে বারবার সেখানে ভৈরবী ভেঙে চুরমার হয়ে গিয়ে 'major chord অর্থাৎ'শুদ্ধ পর্দা’ এসে গেছে। পৃথিবীর বিভিন্ন আঘাতে আঘাতে নতুন নতুন বিস্ময়ের যে ধাক্কা, তার পরিবেশ সৃষ্টি করতে গিয়ে এটা আমি সচেতনভাবেই করেছি। এতে আমার কিছু কিছু নূরজা বন্ধু প্রচণ্ড আপত্তি তুলেছেন, বলেছেন এটা ব্যাকরণে অশুদ্ধ। কথাটি মিথ্যা নয়। কিন্তু আমার মতে আজকের সমাজজীবনের রূঢ়তাকে, বাস্তবতাকে সাধতে প্রকাশ করতে গেলে প্রাচীন ব্যাকরণে অনেক পরিশুদ্ধি-পৃষ্ঠা যোগ করার । আধুনিক গীত' বললেই যাঁরা নাক সিটকন তাদের জানা উচিত সংগীতের আধুনিকতা, আধুনিক বাস্তবতারই সৃষ্টি এবং যে প্রাচীন সংগীতকে তাঁরা আধুনিকের ওপর স্থান দেন সেটাও প্রাচীন যুগের আধুনিক সংগীত' ছিল। যে কারণে আমি থেকে গাড়ি না চোখে বাসে চাপি, সেই কারণেই আমি শব্দসপ্তারের অভিজ্ঞতার গতিকে গান ব্যবহার করি। সুরসৃষ্টি 'কায়দা' সম্পর্কে আমার অভিজ্ঞতা এই যে পুরাবৃষ্টির কোনও বাধাধা কায়দা' নেই, সুরকারের নিজস্ব অনুভূতি এবং সুরকারের ও প্রজাদের অনুভূতির মান -এই দুটোই নির্ধারণ করবে সুর কি হবে। 

 

এই প্রসঙ্গে আমাদের দেশেই সংগীতে যে বিরাট ঐতিহ্য তার সম্পর্কে আমরা অভিহিত সুস্পষ্টভাবে প্রকাশ করা দরকার ।যাতে ভুল বোঝার অবকাশ থাকে না । আমার মতে ভারতীয় লোকসংগীত এবং রাগসংগীত হাজার হাজার বছর ধরে মানুষের বিভিন্ন মত অনুভূতিকে প্রকাশ করতে করতে সোনার খনি তে পরিণত হয়েছে তাকে সার্থকভাবে ব্যবহার করতে পারার ওপর সরকারের ক্ষমতার পরিচয় ভারতীয় সংগীত মেলোডি পৃথিবীর যেকোনো দেশের শ্রেষ্ঠ সংগীতের সঙ্গে সমানে দাঁড়াতে পারে। কিন্তু এটাও ঠিক যে ভারতীয় সংগীত প্রধানত অন্তর্মুখীন (subjective)। বস্তুজগতের (objective world) বিচিত্র শব্দসম্ভারের সমন্বয়ে (conglomeration of sounds) যে symphony সৃষ্টি হয় তার প্রতিফলন ইউরোপীয় সংগীতের orchestra-র মধ্যে এবং সমবেত সংগীতে যে সার্থকতার সঙ্গে ধৃত হয়েছে, সে পর্যায়ে পৌঁছতে এখনও অনেক সাধনার প্রয়োজন ভারতীয় সুরকারদের। যে কোনও গোঁড়ামি আমাদের ক্ষতিই করছে এইটাই আমার দৃঢ় বিশ্বাস।

 

এই প্রসঙ্গে বলা প্রয়োজন objective-এর নাম করে সংগীতের মূল melody কে ভেঙে ফেলার যে উদাহরণ আমেরিকান সংগীতে আমরা পাচ্ছিতাকে music না বলে noise বললেই বোধহয় ঠিক হয়। সংগীতে এই ধরনের anarchism সভ্যতা, সংস্কৃতি এবং ইতিহাসের বিরোধী— বর্বরতার নামান্তর।

 

আজ বিজ্ঞানের অগ্রগতির যুগে আন্তর্জাতিক সাংস্কৃতিক বিনিময় আমাদের সংগীতকে নিশ্চয় প্রচুর সাহায্য করতে পারবে। আমাদের লোকসংগীতের ও রাগসংগীতের জনগণগ্রাহ্য আঙ্গিককে ভিত্তি করে ইউরোপীয় সংগীতের বৈচিত্র্যকে সার্থকভাবে ব্যবহার করা যেতে পারে। আসল কথা মনে রাখা দরকার, সংগীত সুরকারের ব্যক্তিগত বিলাসের জন্য নয় জনগণের জন্য। জনজীবনের বাস্তবতা আজকের সংগীতে এখনও প্রতিফলিত নয়। আমাদের সুরকাররা তাঁদের প্রেরণার জন্যে চেয়ে আছেন পিছনের দিকে। পেছনকে ভুলতে বলি না, পেছনের কথা মনে রেখে সামনের দিকে চেয়ে, বর্তমানের কাঁধে কাঁধ মিলিয়ে চলতে পারাটাই গৌরবের। আমাদের দেশের মানুষ তার আন্দোলনে, তার চেতনায় প্রতিদিনে এক বছরের পথ অতিক্রম করে চলেছে, সেই অনুপাতে আমাদের সংগীত এখনও হয় মোগল দরবারের নয়তো আমেরিকার ভাটিখানায় মুখ থুবড়ে পড়ে আছে। বলিষ্ঠ সমাজ-সচেতন সংগ সৃষ্টির দায়িত্ব সুরকারদের। আমি তাঁদের একজন হিসেবে এবং সংগীতের ছাত্র হিসেবে আমার ক্ষমতা অনুপাতে দায়িত্ব পালনের চেষ্টা করছি মাত্র, বিচারের ভার দেশের মানুষের হাতে। শুধু এইটুকু মনে রাখতে অনুরোধ করব, পরীক্ষা-নিরীক্ষার প্রয়োজন আমাদের সংগীতে এখনও অত্যন্ত বেশি, সে সুযোগ দিতেই হবে সুরকারদের।

 

‘গণনাটা' পত্রিকার প্রথম বর্ষ, প্রথম খণ্ড, শ্রাবণ ১৩৫৯-এ (১৯৫২)-এ এই প্রবন্ধটি প্রকাশিত হয় ।পত্রিকার সম্পাদক ছিলেন সলিল চৌধুরী।-- সম্পাদক

Comments

BNKKHYJHNP10520227629