| | | | | |

শ্রমিকশ্রেণী ও সংস্কৃতি - Shramiksreni O Sanskriti

by হেমাঙ্গ বিশ্বাস | Hemanga Biswas
শ্রমিকশ্রেণী ও সংস্কৃতি - Shramiksreni O Sanskriti

চার-পাঁচ বছর আগের কথা। গড়িয়াহাটার মোড়ে দাঁড়িয়েছিলাম, এক অ্যাল বন্ধুর সঙ্গে। তিনি বোম্বে থেকে কয়েক দিনের জন্য কলকাতা এসেছিলেন। এক সময় বোম্বে গণনাট্যের একজন কর্মী হিসেবে তাঁর সঙ্গে আমার পরিচয়। সেদিন ছিল বিশ্বকর্মা পূজার পরের দিন। প্রতিমা নিরঞ্জনের মিছিল যাচ্ছিল একটি ট্রাকে করে। ট্রাকের সামনে ফেস্টুনে একটি কারখানার নাম ছিল। ট্রাকের ওপর যা নাচ হচ্ছিল তা আমাদের দেশে এক কথায় 'টুইস্ট' নামে খ্যাত। নাচছিলেন সেই কারখানার কয়েকজন প্যান্টগুটানো তরুণ শ্রমিক। বন্ধুটি জিজ্ঞেস করলেন, কীসের মিছিল? বিশ্বকর্মার পরিচয় দিয়ে বললাম 'God of class-collaboration', 'শ্রেণী-সমন্বয়ের দেবতা।

 

হাইড স্কিটের ইঞ্জিনিয়ারিং দেবতাকে আমি এই আখ্যাই দিয়েছি। কেন তা একটু আলোচনা করা যাক এবং তারই সঙ্গে বুর্জোয়া হুল্লোড়বাজি কালচারে শ্রমিকরাও কেন ফ্রমশ অংশীদার হচ্ছেন সেকথা আসবে।

 

কোনও কারখানার বা অফিসে পূজা-পার্বণের অঙ্গ হিসেবে আজকাল থাকে বিচিত্র সাংস্কৃতিক অনুষ্ঠান। সেখানে অনেক সময় দেখা যায় মালিক, ম্যানেজার, বড় বড় অফিসার সবাই খুব উৎসাহী। প্রায়ই তাঁরা টাকাও ঢালেন। সেখানে শ্রমিকরা শ্রেণিভোভেদ ভুলে সবার রঙে রঙ মেশানোর আনন্দে দুদিনের জন্য মশগুল থাকেন। কোনও সময় নালিক, ম্যানেজারের স্ত্রীরাও এসে পরিবেশ আরও মধুর করে তোলেন এবং এদিকরা সমানে সমানে মেলামেশা করে কৃতার্থবোধ করেন। এসব অনুষ্ঠানে মালিকরা চহ প্রচেষ্টা ভিতরে ভিতরে কাজ করে সেকথা শ্রমিক নেতারাও ভাবেন না। অন্যদিকে, এসব ধর্মীয় বা সাংস্কৃতিক ব্যাপারে শ্রেণিসংগ্রামের কী থাকতে পারে আমাদের শ্রমিকশ্রেণির মধ্যেও সে চেতনা জাগ্মত নয়। সেখানে বিভিন্ন অনুষ্ঠানে যে নাটক বা গান হয় তার চরিত্র বিশ্লেষণ কউ করে না— কারণ তা হল আমোদ-প্রমোদের ব্যাপার। এরকম কয়েকটি অনুষ্ঠানে গান গাইতে গিয়ে আমার অভিজ্ঞতা খুবই বেদনাদায়ক। কলকাতার থিয়েটার ভকাগুলিতেও বিভিন্ন ট্রেড ইউনিয়ন পরিচালিত ক্লাবগুলির দ্বারা বছরে যে অসংখ্য নাটক অভিনীত হয়ে সেই সব নাটকের চরিত্র বিশ্লেষণ করা মুল্যবান তথ্য নিতে পারে। তাছাড়া সে সব অনুষ্ঠানে কত টাকা খরচ হয় তা থেকেও সেই সব সাংস্কৃতিক প্রচেষ্টার একটি ছবিমিলতে পারে। সবাই যে 'মিশরকুমারী' বা 'শাজাহান' করেই সন্তুষ্ট থাকেন তা নয়। কেউ কেউ আবার ‘প্রগ্রেসিভ' নাটক করেন বলে গৌরববোধ করেন। তার নমুনা হল— 'নাট্যকারের সন্ধানে ছটি চরিত্র' কিংবা 'সংক্রান্তি। কিন্তু এগুলি আর যা-ই হোক শ্রমিকশ্রেণির দৃষ্টিতে যে 'প্রগ্রেসিভ' নয় সে তর্ক কে করে ওদের সঙ্গে। কিন্তু তর্কের তো কথা নয়– আমোদ-প্রমোদের ব্যাপার। P & T-র একটি ইউনিয়নের কাছ থেকে নিমন্ত্রণ পত্র পাই— নিমন্ত্রণটির অস্তে লেখা আছেঃ "We hope that as in the past we shall not fail to have your sympathy & patronage in the humble effort to make a success of our 'smile for a day' programme in these days of hardships and distress"..

 

‘দুঃখ-কষ্টের দিনে ক্ষণিকের হাসি' এই যেন সংস্কৃতির লক্ষ্য। মনে পড়ে উত্তর ভারতের ট্রেড ইউনিয়ন আন্দোলনের একজন বিখ্যাত নেতার সঙ্গে প্রায় পনেরো বছর আগে যখন আমাকে পরিচয় করিয়ে দেওয়া হয় তখন তিনি রসিকতা করে বলেছিলেন— 'ও নাচ্‌না গানা কী পার্টি?' শ্রমিক নেতাদের অধিকাংশের দৃষ্টি ছিল তাই— এখনও আছে। ফিউডাল আমলে দরবারে ও মন্দিরে নৃত্য-সংগীতের চর্চা হত কিন্তু সেই সমাজে শিল্পীদের অবজ্ঞার চোখে দেখা হত। তাদের সামাজিক স্থান ছিল নিম্নে। নটী ও গণিকা শব্দ দুইটি ছিল সমার্থবোধক। বুর্জোয়া কমার্শিয়াল আর্টকে ব্যবহারিক ও ব্যবসায়িক অর্থকরী দৃষ্টিতে entertainment বা আমোদ-প্রমোদের উপকরণ হিসেবে দেখা হয়। শ্রমিক নেতাদের কারও কাছে উপরোক্ত ফিউডাল দৃষ্টিতে আর্ট পরিত্যাজ্য কিংবা বুর্জোয়া দৃষ্টিতে মিটিংয়ে লোক জমায়েত করা কিংবা চাঁদা তোলার কাজেই আর্টের কার্যকারিতা সীমাবদ্ধ।

 

বুর্জোয়া শ্রেণির কমার্শিয়াল দৃষ্টির পিছনে শ্রেণিচেতনা কিন্তু সদা জাগ্রত। তার ব্যবহারিক দৃষ্টির মানে মানুষের সংগ্রামী চেতনাকে ঘুম পাড়িয়ে সেখানে বুর্জোয়া ধ্যান-ধারণার অনুপ্রবেশ ঘটানো। মালিকশ্রেণিরা অনেকে সচেতনভাবে ক্লাব, গার্ডেন পার্টি, নাচগান, ফিল্ম, পূজা-পার্বণ প্রভৃতি সংগঠিত করেন—যা পূর্বে উল্লেখ করেছি। আজকের একচেটিয়া কবলিত চলচ্চিত্র, গ্রামোফোন ও ব্যবসায়িক মঞ্চ ইত্যাদির কথা এখানে না-ই তুললাম। কিন্তু অন্যদিকে শ্রমিক নেতারা যেখানে আর্টকে শ্রেণিসংগ্রামের হাতিয়ার হিসেবে দেখেন না সেখানে শ্রমিকশ্রেণিও আর্টকে দুঃখ ভুলে দু'ঘণ্টার জন্য  আনন্দ করা ছাড়া অন্য কিছু ভাবতে পারেন না । কিন্তু যেটাকে তারা আসল আনন্দ ভাবছেন সেই অবসরেই যে বুর্জোয়া ভাবধারার সুরা পান করে ভাবে বুধ হচ্ছেন । সে বিচার তারা করছেন না শ্রমিকদের মধ্যে যারা শ্রেণি সচেতন এবং একটু অগ্রসর তাদেরও দেখছি আকর্ষণীয় আঙ্গিকের কৌশল ভেদ করে নাটক বা চলচ্চিত্রের মূল বক্তব্যের বিচারে ভুল করেন। প্রেক্ষাগৃহের বাতি নিভালেই ওঁদের

শ্রেণিচেতনাও নিষ্প্রভ হয়ে আসে। বেশ কিছুদিন আগের কথা, আমি তখন অসমের পাণ্ডুতে রেলশ্রমিকদের মধ্যে গণনাট্য সংগঠন করার কাজে ছিলাম। একদিন একজন জঙ্গিশ্রমিক– তিনি ছিলেন ফায়ারম্যান ইউনিয়ন অফিসের সামনে বললেন, কমরেড আজ একটা সত্যি চমৎকার ছবি দেখে এলাম। তাঁকে জিজ্ঞেস করে জানলাম গল্পটি হল কারখানার ম্যানেজারের অত্যাচারের বিরুদ্ধে শ্রমিকদের সংঘবদ্ধ আন্দোলন অবশেষে জয়যুক্ত হয় এবং মালিক এই ম্যানেজারকে সরাতে বাধ্য হন। অর্থাৎ মূল Villain হল ম্যানেজার মালিক নয়। বললাম, এটা তো একটা প্রতিক্রিয়াশীল ছবি। ইউনিয়ন অফিসে জোর বিতর্ক চলল। অবশ্য অবশেষে শ্রমিক কমরেডটি আমার বিশ্লেষণ মেনে নেন।

 

শ্রেণি সংগ্রাম ও সংস্কৃতি

 

ভারতের শ্রমিকশ্রেণির অর্থনৈতিক লড়াইকে রাজনৈতিক স্তরে উন্নীত করে বীরত্বপূর্ণ সাফল্যের স্বাক্ষর রেখেছেন অনেকে। কিন্তু আদর্শের ক্ষেত্রে এই সাফল্যের কৃতিত্ব তেমন নেই। আদর্শের ক্ষেত্রে এই রাজনৈতিক সংগ্রাম উন্নীত না হলে অর্থনৈতিক ও রাজনৈতিক সংগ্রামের ফল কোনোদিন স্থায়ী হতে পারে না। এইখানে লেনিনের কথা বিশেষভাবে মনে রাখতে হবে। কী করিতে হইবে' গ্রন্থে তিনি বলেছেন যে, মার্কসীয় চেতন— প্রলেতারিয় আদর্শবাদ, শ্রেণিসংগ্রান থেকে আপনা আপনি গজিয়ে ওঠে না। আনে বাইরে থেকে। বৈপ্লবিক বুদ্ধিজীবী তার প্রথম বাহক। শ্রমিকশ্রেণির আন্দোলনের নহযখন মার্কসবানের সমন্বয়ে ঘটে তখনই শ্রমিক আন্দোলন পরিণতি লাভ করে। এখানেই তাকে আদর্শর্গত সংগ্রামের প্রশ্ন। এই আদর্শগত মোর্চায় সবচেয়ে বৃদ্ধ অথ্য সহচয়ে ধারালো অস্ত্রটি হল Culture বা সংস্কৃতি। আবার বুর্জোয়া আক্রমণের সামনে শ্রমিকদের আদর্শগত মোর্চার সংস্কৃতিগত অংশটাই হল সবচেয়ে Vulnerable Section বা সবচেয়ে ভঙ্গুর। কারণ আর্টের কলাকৌশলের মধ্যে বর্ণচারা হয়ে বুর্জোয়া আদর্শ যেভাবে আত্মগোপন করতে পারে অন্য কিছুতেই তে পারে না। অর্থাৎ যে মোর্ডার লাগে সবচেয়ে সতর্ক প্রহরী সেখানেই দেখেছি অনিক নেতৃত্ব অহিফেন নেশায় নিদ্রগত। মাগ্‌গিভাতা ও বোনাসের দাবিতেই শুধু তারা সজাগ।

     এখানে আদর্শগত মোর্চায় ও সংস্কৃতিগত প্রশ্নটার সামান্য আলোচনা প্রয়োজন । আমাদের দৈনন্দিন কত অভিজ্ঞতাপ্রসূত খন্ড খন্ড অনুভব (Perception) থেকে একটা সামগ্রী প্রতাতি (conception) এর তত্ত্বে আমরা পৌঁছায় সেই প্রগতিতে আমাদের মনন(Intellection) এবং আবেগ (Emotion) দুটোই মিশে থাকে। কিন্তু আর সেই মননের ক্ষেত্রকে উন্নততর আবেগের জগতে রুপকল্পের সাহায্যে মহত্বের,ঘনীভূত, স্থায়ী আবেগে রূপান্তরিত করে। একজন সুবক্তা শ্রমিক সমাবেশে শ্রমিকদের এক বিশেষ আন্দোলনকে কেন্দ্র করে বক্তৃতা দিতে উঠে শ্রমিক-মালিক সম্পর্ক – মালিক-সরকার সম্পর্ক–শ্রমিক সংহতি— শ্রমিক নেতৃত্বের ঐতিহাসিক ভূমিকা সমাজতন্ত্রের লক্ষ্য সমস্ত ব্যাপারে প্রপাগান্ডা ও এজিটেশনের সার্থক সমন্বয় করে জোরালো ভাষায় ও বিশ্লেষণে বুদ্ধিবৃত্তি ও হৃদয়বৃত্তি জগিয়ে শ্রমিকদের মধ্যে বিপুল উন্মাদনা জাগাতে পারেন।

 

মনে করুন, তারপরই সমাবেশে একজন মার্কসবাদী সার্থক নাট্যকার ও পরিচালক একটি নাটকে শ্রমিক-মালিক, শ্রমিক সরকারের সংঘাত : কিংবা বৃহত্তর গণতান্ত্রিক আন্দোলনে শ্রমিক নেতৃত্ব সমস্তই আনলেন বাস্তব পরিস্থিতি সৃষ্টি করে জীবন্ত চরিত্র আমদানি করে, দক্ষ চরিত্রায়ণে, কৌশলী অভিনয়ে এবং জোরালো সংলাপে, বক্তা-বর্ণিত সমস্ত বক্তব্যটিকেই তুলে ধরলেন 'হিরো'র চোখে ভাবীকালের সাম্যবাদের স্বপ্ন রচনা করে। শ্রমিক তখন illusion বা রূপকল্পের মাধ্যমে বক্তাসৃষ্ট জগৎ থেকে আরও এক উন্নত মহত্তর ও স্থায়ী জগতে রূপান্তরিত হবেন। একেই বলে আর্টের elevation-এর ভূমিকা। এঙ্গেলস্ যে অর্থে typical চরিত্র বলেছেন, নাট্যকার সমস্ত সংঘাতের মাধ্যমে সেই রকম টিপিক্যাল শ্রমিক হিরো সৃষ্টি করবেন- যা শ্রমিক সাধারণের average নয় তার চেয়ে অনেক ওপরে সমস্ত শ্রমিকশ্রেণির বৈপ্লবিক কল্পনার প্রতিভূ। এমনিভাবে তৈরি হয়েছে মাক্সিম গর্কির 'মা' এবং 'প্যাভেল' কিংবা অদ্ভুভস্কির ইস্পাতের 'কোর্টাগিন'। এরা চিরস্থায়ী চরিত্র-শ্রমিকের চিরস্থায়ী প্রেরণা। আর আই এন এ বিদ্রোহে বোম্বের শ্রমিকশ্রেণির অংশগ্রহণ ও আত্মদান–ইতিহাসের শুকনো পাতায় ছিল— কোনও বক্তণর বাহাদুরিতে তা জীবন্ত হত না। কিন্তু করোনে'র শার্দুল সিং, সুভাষ দেশাই এবং কৃষ্ণাবাঈ, ওদের মধ্যে এঁরা হয়ে উঠলেন জীবন্ত, চিরস্থায়ী শ্রমিকদের চিরন্তন প্রেরণার উৎস। তাই তা ইতিহাসের চেয়েও বড়। আমরা যখন শ্রমিক সমাবেশে, কৃষক সমাবেশে সফল নাটক বা গান করি তখনই বুদ্ধিজীবী শিল্পীদের বৈপ্লবিক ভূমিকা সম্পর্কে শ্রমিক বা কৃষক সাধারণ আমাদের সচেতন করে দেন তাদের উদ্দীপ্ত সহযোগিতার মাধ্যমে। কিন্তু 'রঞ্জামে' বসা শ্রমিক নেতাদের সে বিষয়ে সচেতন হতে কোনোদিন দেখি নি। একটা ঘটনা আমার প্রায়ই মনে হয়।১৯৪৮-৪৯ ইংরেজিতে আমি যখন আমার বিখ্যাত মাউন্টব্যাটেনের মঙ্গলকাব্য নিয়ে কলকাতায় আসি তখন পরীক্ষামূলকভাবে এই গানটি প্রথমে গাই পার্কসার্কাসের ট্রাম শ্রমিকের এক মেসে। আমার সঙ্গে ছিলেন বিনয় রায়। ট্রাম শ্রমিকের মধ্যে এই গানটি বিপুল সংবর্ধনা প্রায়। সকলেই জানেন গানটির ক্ষমতা হস্তান্তর যে আমাদের সত্যিকারের স্বাধীনতা দেয়নি সেই কথাটি তীক্ষ্ণ ব্যঙ্গাত্মক ও সুরে বলা হয়েছে। কিছুদিন পর সর্বভারতীয় শ্রমিক ধর্মঘটের প্রস্তুতিতে ময়দানের এক 

 

বিরাট সমাবেশের প্রারম্ভে গানটি যখন গাই— শ্রোতাদের মধ্যে প্রচণ্ড সাড়া পড়ে যায়। গানটি একটু দীর্ঘ। গানটি শেষ হওয়ার আগেই একজন শ্রমিক নেতা আমার কাছে এসে বললেন— 'তাড়াতাড়ি শেষ করুন; মিটিং আরম্ভ হবে।'

 

শ্রমিকশ্রেণিকে সাংস্কৃতিক আন্দোলনের নেতৃত্ব নিতে হবে

 

আমাদের সমাজ ব্যবস্থায় নাট্যকার-অভিনেতা-গায়ক-নৃত্যবিদ প্রভৃতি— যাকে বলে পেটি বুর্জোয়া শ্রেণি থেকে উদ্ভূত। এঁদের মধ্যে যারা শ্রমিকশ্রেণির আদর্শে উদ্বুদ্ধ সে সব বৈপ্লবিক শিল্পী ও সাহিত্যিকের কাছ থেকে শ্রমিকশ্রেণিকে অনেক কিছু শিখতে হবে। আমি আগেই লেনিনের উদ্ধৃতি দিয়ে বলেছিলাম যে শ্রেণি সংগ্রামের মধ্যে থেকেই সমাজতন্ত্রের জন্ম হয় না। সমাজতন্ত্রের ধ্যান-ধারণার শিল্পসুলভ রূপায়ণের কলাকৌশল আয়ত্ত করার জন্য বৈপ্লবিক বুদ্ধিজীবী ও শ্রমিকশ্রেণির সহযোগিতা ও সহশিক্ষার খুবই প্রয়োজন। ব্যাপারটা একতরফা নয়। বুদ্ধিজীবীদের শ্রমিকদের সঙ্গে গভীরভাবে মেলামেশা করে তাঁদের আন্দোলনের সমস্ত কলাকৌশল শিখতে হবে প্রথম। শুধু তাই নয়, শ্রমিকদের একটা নিজস্ব সাংস্কৃতিক ঐতিহ্য ও প্রকাশভঙ্গি আছে। বুদ্ধিজীবীদের প্রথম এসব বিষয়ে জানতে হবে। তখনই তাঁরা শিক্ষক হতে পারবেন। তার অর্থ এই নয় যে অর্থনৈতিক ও রাজনৈতিক সংগ্রামে শ্রমিকশ্রেণি নেতৃত্ব করবে আর সাংস্কৃতিক ক্ষেত্রে বুদ্ধিজীবী নেতৃত্ব করবে। এইটি একটি অতি মারাত্মক বুর্জোয়া ধারণা যা শুধু কেবলমাত্র বুদ্ধিজীবীদের মধ্যেই নয়, এমনকি শ্রমিক নেতাদের মধ্যেও বন্ধমূল হয়ে আছে। এ ধারণা শ্রমিকদের উৎপাটন করতেই হবে। আমাদের আদর্শগত মোর্চায়ও প্রধান প্রহরী হল শ্রমিক। বুদ্ধিজীবীদের হাতে তার কোনও Sector বা অংশ ছেড়ে দিলে সেদিক থেকেই আসবে একচোখো হরিণের নিকে বুর্জোয়ার বিষ তির। শ্রমিকশ্রেণির মধ্যে সেই প্রতিভা রয়েছে। তার কয়েকটি মাত্র দৃষ্টান্ত এখানে দিচ্ছি:

 

গণনাটোর জন্মের প্রথম বছরেই ১৯৪৩ সালে যখন কলকাতায় আসি তখন এক ডক-মজুরের রচিত গান আমাদের চমকিয়ে দিল। তার সহজ কথা ও সুরের জোরালো আবেদনে এবং বক্তব্যের আন্তর্জাতিকতায় আমাদের সমস্ত গানের মধ্যে নতুন হাওয়া বইয়ের দিল লাল-সবুজে সামনে তখন ফ্যাসিস্ট বাহিনীর পিছু হটতে শুরু করেছে সেই গানটির প্রথম লাইন গুলি ছিল: 

"লাল ফৌজের সুরু কিয়া হ্যায়

 লাল ক্রান্তিকা জং

 উসকে জিত্সে জনতা জাগে 

লাল ফাড়িয়ারা লে বাড়ে আগে

আজাদশাহী দুনিয়া হোগী আজাদী বা রং

 

দেখো আজাদী কা রং। 

 

আমরা যখন জাপানি রোখার গান লিখছি তখন হঠাৎ এই দৃষ্টিতে বিশ্বক্রান্তির গান আমাদের যেন নতুন দিঘলয়ের সন্ধান দিল। সর্বভারতীয় ক্ষেত্রে বোম্বের হরিয়ন শ্রমিক আন্নাভাও শাঠে রচিত ‘স্টালিনগ্রাদ পোয়াডা' সুর, কাব্য ও আন্তর্জাতিক ভাবাদর্শের উদ্দীপ্ত 'ব্যালাড' ফর্মে গাওয়া গানটি তেমনি আমাদের এক নতুন পথের সন্ধান দিয়েছিল। গণনাট্যের এলাহাবাদের সম্মেলনে আন্নাভাও শাঠেকে আমরা সর্বভারতীয় গণনাট্যের সভাপতি নির্বাচিত করি। বোম্বের শ্রমিক সন্তান উমর শেখের কন্ঠের কাছে গণনাট্যের গানের স্কোয়াড দাঁড়াতে পারত না। দক্ষিণ ভারতে অঙ্কের যে নাটকটি সেখানকার নাট্য আন্দোলনে এক রূপান্তর এনেছিল সেই 'মাতৃভূমি'র রচয়িতা হলেন শঙ্কর সত্যনারায়ণ যিনি ছিলেন একজন শ্রমিক সন্তান। কলকাতার ট্রাম শ্রমিক দশরথ লাল ঢোলক বাজনায় ও সংগীত রচনায় এমন দক্ষতা দেখালেন যে তাঁকে বোম্বেতে গণনাট্যের সেন্ট্রাল স্কোয়াডে নিয়ে যাওয়া হয়। বোম্বের চলচ্চিত্রের চটুল শ্রমের গানগুলি শ্রমিকদের মধ্যেও আজ খুব ছড়িয়ে পড়েছে। গত যুদ্ধের সময় এমন । একটি অতি জনপ্রিয় গান ছিল আঁথিয়া মিলাকে— জীয়া ভরমাকে চলে নাহি যানা' ট্রাম শ্রমিক মানিক তার প্যারডি করে মালিকের বিরুদ্ধে গাইলেন— হামারা দেশমে আইকে, হামারা পইসা বাইকে

 

আঁখ না দেখানা!

 

রহতা বিল্ডিংমে সাহাব হামারা দুখ না জানা। মাঙ্গেগৈর মজুদর মাসেতো গুলিকা নিশানা।।"

 

মানিক এমনি বহু গান লিখেছিল কিন্তু ট্রাম শ্রমিক নেতৃত্ব সেইসব গানের কোনও

 

বই বের করবার চেষ্টা করেন নি কিংবা আমাদের মধ্যে তা প্রচারেরও কোনও প্রচেষ্টা

 

ছিল না। মেটিয়াবুরুজের শ্রমিক সন্তান তরল গায়ক গুরুদাস পাল বহুবার প্রমাণ করেছেন। যে গণ-সমাবেশে তিনি আমাদের চেয়ে বড় শিল্পী।

মার্কসবাদের লাল ঝাণ্ডার নীচে সংঘটিত শ্রমিকশ্রেণী সারা ভারতে এমনি বহু শিল্প জন্ম দিয়েছে বিশ্ব শ্রমিক শ্রেণীর গান (Internationale) বা আন্তর্জাতিক এই শ্রমিকেরই রচনা।

   ১৮৭১ সালে প্যারি কমিউন প্রতিষ্ঠিত বিশ্বে প্রথম শ্রমিক রাষ্ট্রকে বুর্জোয়ার রক্তে ডুবিয়ে দিলেও তা চিরজীবী সেই বিপ্লবের অংশগ্রহণকারী এবং সেই কমিউনে নির্বাচিত একজন শ্রমিক ইউজেন প্রোটিয়া ছিলেন কবি ও গীতিকার তিনি রচনা 

 

করেন এই 'আন্তর্জাতিক'। এই গানটি সম্পর্কে লেনিন বলেছিলেন: “শ্রমিকের আন্তর্জাতিক চেতনার চিরনতুন উৎস হল– এই গানটি।”

 

শ্রমিকদের মধ্যে সাংস্কৃতিক আন্দোলনের জোয়ার আনতে হবে কেন?

 

আমাদের দেশের শ্রমিকদের মধ্যে আজ সেই আন্তর্জাতিকতাবোধ কোথায়? সব কি মাগ্‌গিভাতা আর বোনাসের দাবিতে চাপা পড়ল? সেই ফাঁকে বুর্জোয়া ভাবাদর্শের বীজাণু তার দেহের মধ্যে অনুপ্রবেশ করে তাকে পঙ্গু করে দিয়েছে। আজকাল শ্রমিক জমায়েতে আর আগের মতো সমবেত কণ্ঠে গাওয়া সেই প্রাণ-নাচানো গানটি শুনতে পাই না:

 

মেহনতৰ্কশ উঠ ইস্‌মে আ

 

হাতমে কাগ লাল উঠা

 

জুলুমকে নাম নিশা মিটা উঠইসূমে আ বেদার হো যা...

 

পরিবর্তে এসেছে বুর্জোয়া জাতীয়তাবান। এ প্রক্রিয়া অবশ্য অনেকদিন আগে থেকেই শুরু হয়েছিল। শ্রমিক নেতৃত্বের জায়গায় যখন আমরা ধ্বনি তুললাম ‘ঙ্গী-চিল্লা এক হও। গণনাট্যে গান তৈরি হল 'কংগ্রেস লিগ এক হও– হাতে হাত বেঁধে রও। কিন্তু তার চেয়েও দুঃখের কথা— কলকাতার এক বিড়ি শ্রমিক গান লিখলেন এবং গাট্য তা প্রচার করল—

 

দরওয়াজেমে জাপান আ পোঁছা

উঠ  হুসমে আ-ওঠ হুসমে আ

 

গান্ধীরা কলম, চিল্লাকা কম হলোহার উঠা তলোয়ার উঠা।।

 

কিন্তু আরও আক্ষেপের কথা, ১৯৪৮ সালে আহমেদাবাদ সর্বভারতীয় গণনাট্য অতি নিক গায়ক উত্তর শেষ ভারতীয় বংগ্রেসি বুর্জোয়া নেতাদের প্রধান জানিয়ে যখন গাইলেন:

'ভারত সাংঘকি দূরবিজয়ী নেতা তুঝে প্রণাম...'

 

   এই আদর্শগত অবনতির জন্যই এইবার সাম্প্রদায়িক দাঙ্গা শ্রমিক অঞ্চলগুলোতেও এমন ব্যাপক হতে পারল । সাম্প্রদায়িকতা, প্রাদেশিকতা, মধ্যযুগীয় কুসংস্কার সমস্ত শ্রমিকদের মধ্যে আছে। কোনো সঙ্কট দেখা দিলেই তা মাথাচাড়া দেয় অসমে ভাষা দাঙ্গার সময় দেখেছি সাময়িকভাবে হলেও শ্রমিকশ্রেণীকে দ্বিধাবিভক্ত হয়ে যেতে । আজকে প্রতিক্রিয়াশীল শাসক ও শোষণের সুযোগ নিচ্ছে। ভিডিও সিনেমা প্রতীক লোকজনের mass-medium গুলি একচেটিয়া কর্তৃত্বাধীনে চলে গেছে। তার মাধ্যমে যে culture offensive বা সংস্কৃতিক আক্রমণ তারা চারিদিক থেকে শুরু করেছে— শ্রমিক নেতৃত্ব সে বিষয়ে কতটুকু সজাগ? এসময় আদর্শগত প্রচারের জন্য শ্রমিকদের মধ্যে সংস্কৃতি আন্দোলনের এক বিরাট ভূমিকা রয়েছে।

 

আর্ট ফরম বা আঙ্গিকের সমস্যা

 

এখানেই আসবে আর্টের যে হাতিয়ার নিয়ে শ্রমিকরা লড়বে তার স্বরূপটা কীরকম হবে, অর্থাৎ আর্টের ফরম বা আঙ্গিকের সমস্যা। কিন্তু আঙ্গিকের সমস্যাটি দর্শক, শ্রোতা— কার ওপর নির্ভর করে। কার জন্য? কীসের জন্য? এখানেই আসে আর্টের পার্টিজানশিপ বা পক্ষাবলম্বনের প্রশ্ন। আমাদের শ্রোতা যদি হয় শ্রমিকশ্রেণি ও তার সহগামী কৃষকশ্রেণি— উদ্দেশ্য যদি হয় তাদের সবাইকার মধ্যে পৌঁছানো— রাজনৈতিক ও আদর্শগত সংগ্রাম শাণিত করা সংগঠিত করা। তখন আমাদের রাস্তার মোড়ে, ট্রাকে, মাঠে ময়দানে, মহল্লায় সর্বত্র আমাদের পৌঁছাবার আর্ট ফরমও হবে। বছরে দু-একবার বদ্ধঘরের মঞ্চটা আমাদের কাছে হবে গৌণ। আমাদের ফরমও হবে নানারকম। নাটিকা, পথনাটিকা, গানের স্কোয়াড, আবৃত্তি, মুশায়ারা থেকে আরম্ভ করে যাত্রা, বড় নাটক সব হাতিয়ারই রপ্ত করতে শিখতে হবে। শ্রমিকদের মধ্যে ইতিমধ্যে যা চালু আছে যেমন- বিহার ও উত্তরপ্রদেশের যেসব শ্রমিক আছেন তাদের নওটস্কি, আল্হা বা রনিয়া প্রভৃতি ফরম কিংবা উর্দুভাষী শ্রমিকদের গজল, কাওয়ালি, মুশায়ারা প্রভৃতি অত্যন্ত জোরদার মাধ্যম। কিংবা বাঙালিদের মধ্যে তরজা, কথকতা, জারি, গম্ভীরা ইত্যাদি আঙ্গিক কাজে লাগাতে হবে। শ্রমিকরা এসেছেন কৃষকদের মধ্যে থেকে–ওইসব হল কৃষকদের ঐতিহ্যবাহী লৌকিক ফরম, শ্রমিকদের আর আলাদা তেমন ফরম নেই। তবে এই ফরমগুলিকে তার পুরোনো অনেক অমার্জিত অবস্থা থেকে আজকের বৈপ্লবিক বিষয়বস্তু দিয়ে revitalise বা পুনরুজ্জীবিত করার সমস্যা আছে। নাগরিক শিল্পীদের কাছ থেকেও তাঁদের নিতে হবে প্রয়োগ নৈপুণ্য ও বলাকৌশল। কিন্তু শ্রমিকদের সবসময় ফরমের নামে formalism বা ফরম প্রাধান্যের বিপদ থেকে সাবধান থাকতে হবে। কী নাটক করবো, কি গান গাইবো, কিভাবে করব ভালো নাটক, ভালো গান পাব কোথায়? এইসব প্রশ্ন উঠবে কিন্তু সে আলোচনা নিয়ে এ প্রবন্ধ আর দীর্ঘ করবো না।

 

নিজেদের সাংস্কৃতিক সংগঠন চাই

 

বিপিটিসি আপাতত উদ্যোগ না নিলে প্রত্যেক ট্রেড যেমন ট্রাম্প ওয়ার্কার্স ইউনিয়ন কেন্দ্রীয় কালচারাল বুড়ো তৈরি করে বিভিন্ন বাঞ্চ সৃষ্টি করে তার মাধ্যমে সংস্কৃতি আন্দোলন সংগঠিত ও পরিচালিত করতে পারেন। ব্রাঞ্চগুলিতে ব্রাঞ্চ কমিটি দ্বারা সংগঠিত সংস্কৃতি কেন্দ্র শুধু নাটক গানের জন্য নয়— সেখানে লাইব্রেরি, দেওয়াল পত্রিকা, আলোচনা, স্টাডি ক্লাস এবং বাহির থেকে বিশেষ বিষয়ে উপযুক্ত ব্যক্তির দ্বারা ক্লাস ইত্যাদি পরিচালনা করতে পারেন।

 

কেন্দ্রীয় কালচারাল ব্যুরো অন্যান্য ট্রেডের শ্রমিক শিল্পীদের সঙ্গে যোগাযোগ রাখতে পারেন এবং মিলিত অনুষ্ঠান করে ট্রেডে ট্রেডে আজ যে বিচ্ছিন্নতা তা ভেঙে সংহতি স্থাপন করতে পারেন।

 

কেন্দ্রীয় কালচারাল ব্যুরো শহরে প্রগতিশীল নাট্য সংস্থাগুলির সঙ্গে যোগাযোগ রেখে এবং তাদের মধ্যে থেকে বিশিষ্ট শিল্পী ও পরিচালকদের শ্রমিকদের সাহায্য করার কাজে আনতে পারেন। শ্রমিকদের মধ্যে যে সুপ্ত প্রতিভা তা থেকে এমনি ব্যাপক সাংস্কৃতিক আন্দোলনের মাধ্যমে নতুন নতুন শিল্পীর স্ফুরণ হবেই। কিন্তু তাদের শ্রমিক আন্দোলনের মধ্যেই রাখতে হবে। দশরথ লালের মতো আমরা যদি তাকে ছিনিয়ে নেই তবে তার মৃত্যু অবধারিত। দশরথ লাল পরে জীবিকার জন্য কলকাতাতেই ফিরে এসে এক মাংসের দোকানে মাংস কাটার কাজ নেন। পরে এক লিটল ব্যালে থিয়েটারে যোগ দিয়ে পুরোমাত্রায় বিশুদ্ধ শিল্পী'তে রূপান্তরিত হন। একজন শ্রমিক শিল্পীর কী পরিণতি। একথাগুলি বলছি এজন্য যে শিল্পী সাজলেই মনে মনে একটা অসাধারণ গায় এবং শ্রেণিবোধের চেয়ে ব্যক্তিবোধ বড় হয়ে থাকে বিশেষ করে বর্তমান পরিবেশে।

 

যাই হোক, এই হল ভবিষ্যতের কথা। বর্তমানে ট্রেড ইউনিয়ন আন্দোলনে সংস্কৃতির বৈপ্লবিক ভূমিকা সম্বন্ধে অগ্রগামী শ্রমিকদের সচেতন হতে হবে। তাঁরা যদিন এনে অগ্রণী ভূমিকা নেন তবে শুধু শ্রমিক আন্দোলনেই নয়, শহরের মানিত শিল্পীদের মধ্যে সীমাবদ্ধ সংস্কৃতি আন্দোলনেও সত্যিকার প্রাণ সঞ্চার করতে পারবেন। তখন বিশ্বকর্মার অর্থাৎ ইঞ্জিনিয়ারিং-এর দেবতার পূজার মধ্যানে সামুষ্টি করতে হবে না, নিজেরাই হবেন 'Engineers of human soul' মানবতার কারিগর

 

ট্রাম-বার্তা , ১ম সংকলন কলকাতা নভেম্বর ১৯৬৬

Comments

LOYVPBPSWT128202203552