| | | | | |

ভারতীয় সংগীতের নতুন ধারা | Bharotiyo Sangiter Notun Dhara

by পণ্ডিত রবিশংকর | Pandit Ravishankar
ভারতীয় সংগীতের নতুন ধারা | Bharotiyo Sangiter Notun Dhara

শাস্ত্রে সংগীতকে ভগবদ-প্রাপ্তির সোপান মনে করা হত। প্রাচীনকালে সংগীতজ্ঞরা অন্য সকল চিন্তাভাবনার প্রতি বিমুখ হয়ে সমস্ত জীবন শুধুমাত্র সংগীত সাধনায় নিমগ্ন থাকতেন। জীবিকা উপার্জনের কোনও চিন্তা ছিল না তাদের, কারণ— প্রথমত, তাঁদের প্রয়োজনীয়তাই ছিল সামান্য এবং দ্বিতীয়ত, তারা থাকতেন রাজা মহারাজা ও নবাবদের আশ্রয়ে। এইভাবে সংগীতজ্ঞদের একটি পৃথক সমাজ গড়ে উঠেছিল। এঁদের দ্বারা সংগীতের প্রভূত উন্নতি সাধন হয়, কারণ—অভ্যাস ও গবেষণা চালানোর মতো পর্যাপ্ত সময় এঁদের হাতে ছিল, সামাজিক ব্যবস্থা এঁদের অনুকূল ছিল।

 

কিন্তু অপরদিকে সংগীতজ্ঞদের এই পৃথকীকরণের দরুন ক্ষতি হয়েছে যথেষ্ট। প্রথমত, এই সংগীতজ্ঞরা জনসাধারণ থেকে দূরে সরে যেতে লাগলেন, এঁদের পৃথক পৃথক ঘরানা গড়ে উঠল। তাঁদের গায়কি ভিন্ন ধরনের হয়ে গেল। সংগীতজ্ঞদের শিল্পকলা মুষ্টিমেয় ওস্তাদদের ও ঘরানার মধ্যে সীমাবদ্ধ রয়ে গেল, কারণ ঈর্ষাবশত এঁরা নিজেদের আয়ত্ত শিল্প অপরকে শেখাতেন না। দ্বিতীয়ত, অশিক্ষা ও সংকীর্ণ মনোবৃত্তির দরুন এঁদের চারিত্রিক অধঃপতন ঘটল। শিল্পসাধনার স্থান অহমিকার রূপ পরিগ্রহণ করল এবং এঁরা নিজেদের অন্যান্যদের অপেক্ষা ঊর্ধ্বে মনে করতে লাগলেন। সংগীতশাস্ত্রের বৈজ্ঞানিকতা থেকে দূরে সরে গিয়ে সত্যিকারের সংগীতজ্ঞ হওয়ার পরিবর্তে এঁরা হয়ে গেলেন 'টেকনিশিয়ান'। কেরামতি বিদ্যায় আটকা পড়ে এঁদের শিল্পবলা অধিকাংশ সময়ে 'গলাবাজি'র পর্যায়ে আবদ্ধ রয়ে গেল।

 

সংগীতজ্ঞদের চলা-ফেরা, চারিত্রিক দুর্বলতা ইত্যাদির জন্য জনসাধারণও তাঁদের 'একঘরে' করলেন। সভ্যসমাজ কর্তৃক এঁদের বহিষ্কারের আরও একটি কারণ ছিল। মোগল সাম্রাজ্যের অবনতি হওয়ার পর যখন এঁদের রাজদরবারের অভিভাবকত্ব শেষ হল, তখন এঁদের সামনে জীবন ধারণের প্রশ্ন দেখা দিল। কয়েকজন উচ্চসরের সংগীতর হিন্দু রাজাদের আশ্রয়ে চলে গিয়ে তাঁদের শিল্পসাধনায় রত হলেন। কিন্তু অধিকাংশেরই অবস্থার অবনতি ঘটল। এঁরা পূর্বেই জনসাধারণের সঙ্গে কোনও সম্বন্ধ রাখেন নি তাই জনসাধারণ এঁদের কোনও আশ্রয় দিল না। ফলে এই সংগীতজ্ঞরা যতখানি উচ্চে উঠেছিলেন, ঠিক ততখানি নিম্নস্তরে নেমে গেলেন এবং এঁরা গণিকা বা তাঁর দালাল হয়ে সংগীতের নামে মানুষের যৌন-ভাবনা নিয়ে জুয়াখেলা শুরু করলেন। এঁরা নিজেদের সাথে সাথে সংগীতকলাকেও ডোবালেন। সংগীতের প্রতি জনসাধারণের ঘৃণ্য উৎপন্ন হল। এর প্রভাব এখনও পর্যন্ত চলছে।

 

সংগীতের হাত-গৌরব পুনঃপ্রতিষ্ঠা করার জন্য স্বর্গীয় বিষ্ণু দিগম্বর ও ভাতখগুেজি যে প্রচেষ্টা করেছেন তা সত্যই প্রশংসনীয়। সংগীত প্রচারকল্পে এঁরা যে পরিশ্রমই করেছেন তাই নয়, এঁরা বহু লুপ্ত এবং হারিয়ে যাওয়া 'রাগ'কে পুনরুদ্ধার করেছেন। তাঁরাই সর্বপ্রথম ভারতীয় সংগীতে স্বরলিপি পদ্ধতির আবিষ্কার করে রাগগুলির অবলুপ্তি রোধ করলেন। গান্ধর্ব মহাবিদ্যালয় এবং মরিস্ কলেজের স্থাপনা করে বিষ্ণু দিগম্বরজি ও ভাতখগুেজি সংগীত প্রচারের ভিত্তিকে আরও সুদৃঢ় করে দিলেন।

 

সংগীত বিদ্যালয়

কিন্তু একথা মনে করলে ভুল হবে যে এই শিক্ষালয়গুলি স্থাপিত হওয়াতেই উচ্চশ্রেণির সংগীতজ্ঞ সৃষ্টি হতে থাকল বা সংগীতকলার উন্নতি ঘটল। ভাতখগুেজির ভাষায়, “এই সংগীত শিক্ষালয়গুলির মাত্র এইটুকু আশা ছিল যে নতুন নতুন শিক্ষার্থীদের প্রাথমিক শিক্ষা দিয়ে কোনও গুরুর নিকট উচ্চশিক্ষার জন্য প্রস্তুত করা।” কিন্তু দুর্ভাগ্যবশত তা হল না। উপাধি লাভ করে যাঁরা সংগীতশিক্ষক হয়ে গেছেন এবং নিজের নিজের স্কুল খুলে বসেছেন তাঁরা সংগীতের স্তরকে নামিয়ে দিতেই সাহায্য করছেন। উপরন্তু এঁদের উদ্দেশ্য আর্থিক লাভ ছাড়া আর কিছুই নয়।

 

এর জন্য সংগীত শিক্ষালয়গুলির শিক্ষার্থীরাও কম দায়ি নন। তাঁরা সংগীত শিখছেন সাধনার জন্য নয়, কেবলমাত্র বন্ধুবান্ধবদের কাছ থেকে খ্যাতি আর সম্মান পাওয়ার লোভে এবং যেহেতু বিবাহপোযোগ্যা মেয়েদের গান-বাজনা জানাও প্রয়োজনীয় তাই অধিকাংশ পিতামাতারা নিজেদের মেয়েদের সংগীত শিক্ষালয়গুলিতে ভর্তি করতেন। বিবাহের পর যৌতুক প্রাপ্ত তানপুরা, সেতার, বেহালা ইত্যাদির ধুলো বছরের পর বছর পরিষ্কার হত না।

 

আমার অভিপ্রায় কখনও এ নয় যে আমি সংগীত শিক্ষালয়ের বিপক্ষে। আমার অভিযোগ এই যে শিক্ষালয়গুলি তাঁদের কাজ ঠিকমতো করছেন না। সংগীতের প্রচারের জন্য অন্যান্য বিদ্যালয় গুলিতে সংগীতশিক্ষাকে অবশ্য শিক্ষণীয় বিষয় করে দেওয়া উচিত। এর দ্বারা দুপ্রকার লাভ হবে। প্রথমত, বোঝা যাবে যে, কোনও শিক্ষার্থীর মধ্যে সংগীত শিক্ষা লাভের কতখানি যোগ্যতা আছে ।দ্বিতীয়তঃ অধিক শিক্ষার্থীর সংগীতের প্রতি অনুরাগ জন্মাবে এবং তারা সংগীত অনুষ্ঠান গুলিতে উৎসব গান শুনবে যে সকল শিক্ষার্থী পূর্বেই সংগীত শিক্ষা লাভ করতে চায় তারা সংগীত শিক্ষালয় গুলিতে যেতে পারে।

 

কেবলমাত্র সেই শিক্ষার্থীদের ভর্তি করা উচিত যাদের মধ্যে প্রথম শ্রেণির সংগীতজ্ঞ হওয়ার যোগ্যতা আছে। এখানকার শিক্ষকদেরও অত্যন্ত যোগ্যতাসম্পন্ন হওয়া উচিত। কিন্তু একথা আশা করা ভুল হবে যে ওস্তাদ এবং বিধানদের এখানে শিক্ষক নিযুক্ত করা যাবে। এই সব প্রাচীনপন্থী সংগীতজ্ঞেরা এই সংস্থা'র পদ্ধতির সাথে সামঞ্জস্য সাধন করতে পারবেন না, কারণ এঁদের রন্ধ্রে রন্ধ্রে গুরুশিষ্যের সম্বন্ধ পরিপাটিভাবে মিশে গেছে। এইজন্য এই সমস্ত গুরুদের আপন আপন স্থান থেকে উপড়ে এনে এই কেন্দ্রীয় সংস্থায় একত্রিত করার পরিবর্তে তাদেরকে স্ব-স্ব ক্ষেত্রে রেখে দিয়ে সাহায্য করা হোক। সংস্থার উন্নত শিক্ষার্থীগণ পাঁচ-ছয় বছরের জন্য ওদের নিকট গিয়ে শিক্ষালাভ করুক এবং পুনরায় সংস্থায় প্রত্যাবর্তন করে অন্যান্য শিক্ষার্থীদের শিক্ষাদান করুক। এই কেন্দ্রীয় সংগীত সংস্থাতে শুধুমাত্র শিক্ষাদান করলেই হবে না বরং সংগীতের ক্ষেত্রে নতুন গবেষণা করার জন্য উৎসাহ দেওয়া দরকার এবং উপকরণ সংগ্রহ করা দরকার। সরকার কর্তৃকই এই সংস্থা নিয়ন্ত্রিত হওয়া উচিত।

 

সংগীতের প্রচারের জন্য এবং জনসাধারণের সামনে উচ্চস্তরের সংগীতজ্ঞদের উপস্থিত করার জন্য ইদানীং সংগীত সম্মেলনগুলির আয়োজন বৃদ্ধি পেয়েছে। একথা তো ভালোই কিন্তু সম্মেলনের উদ্যোক্তাদের অজ্ঞানতাবশত এই সংগীত-সভাগুলি সফলতা লাভ করতে পারে না। এই সম্মেলনের কার্যক্রম এমনভাবে স্থির করা হয় যে একই অধিবেশনে স্থানীয় শিক্ষানবিশদের গান, ফিল্ম সংগীতগায়কদের গান, উদ্যোক্তাদের পরিচিত লোকেদের মেয়েদের হাল্কা গান, বাদ্যসংগীত ইত্যাদি থেকে শুরু করে ওস্তাদি গান পর্যন্ত একই সাথে করা হয়ে থাকে।

 

এর ফল এই হয় যে সন্ধ্যা থেকে বসে শ্রোতারা যখন বিরক্ত হয়ে যান ও নিদ্রা বোধ করতে থাকেন তখন হয়তো রাত তিনটে বা চারটের সময়ে ওস্তাদদের পালা আসে কিন্তু ততক্ষণে ওস্তাদরা প্রান্ত হয়ে যান ও শ্রোতাদের উৎসাহে ভাটা পড়ে যায় এবং ওস্তানদের শিল্পকলা চন্দ্রাতিভূত শ্রোতাদের চতুপাশে ঘুরে ফিরে নিরাশ হয়ে যায়।

 

মাল্লাজ নিউজিক আকাদেনি কর্তৃক আয়োজিত সংগীত সম্মেলনের কার্যক্রম অনুকরণীয়। প্রথম অধিবেশন বেলা তিনটে থেকে পাঁচটা পর্যন্ত হয়। এই অধিবেশনে আয় প্রথম শ্রেণির পর্যায়ে পড়েন এমন উদীয়মান সংগীতদের অনুষ্ঠান হয় প্রত্যেককে দু'ঘণ্টা সময় দেওয়া হয় তারপর বৈকাল পাঁচটা থেকে আটটা পর্যন্ত প্রথম শ্রেণীভূক্ত ওস্তাদদের পালা আসে ,তারপর রাত্রি নটা থেকে এগারো টা পর্যন্ত বাদ্য সংগীতের অনুষ্ঠান হয় এতে উত্তর ভারতের বাদ্যযন্ত্র শিল্পীরাও অংশগ্রহণ করেন।

 

এই অধিবেশনেই ওস্তাদ এবং বিধানদের অনুষ্ঠান হয়। সংগীতের অনুষ্ঠান ব্যতীত এক গুরুত্বপূর্ণ অধিবেশন সকাল সাতটা থেকে দশটা পর্যন্ত হয় যাতে বিদ্বান ও অন্যান্য সংগীতজ্ঞরাও অংশগ্রহণ করেন। এই অধিবেশনে সংগীতের মূলনীতি সম্বন্ধে রচনাত্মক ভাষণ ও বিতর্ক হয়। কোনও প্রথম শ্রেণির বিধান এর সভাপতি হন, বিভিন্ন ঘরানা ও গায়কিতে আলাপ, বোলতান প্রভৃতির অনুষ্ঠান করা হয়। রাগের শুদ্ধরূপ ব্যাথা করা হয়। এইভাবে একে অপরের নিকট থেকে শিক্ষালাভ করেন এবং বিতর্কমূলক বিষয়ের নিরসন করা এই অধিবেশনের মুখ্য উদ্দেশ্য হয়ে দাঁড়ায়।

 

ফিল্ম- সংগীত

জনসাধারণকে সংগীতপ্রিয় করে তোলার কাজে ফিল্ম-সংগীতের যথেষ্ট গুরুত্ব আছে। এর প্রধান কারণ দুটি। এই গানগুলির ভাষা সাধারণের পক্ষে বোঝা সহজ। দ্বিতীয়ত, এর সুর অত্যন্ত সহজভাবে সকলেই গাইতে পারে। তাছাড়া চলচ্চিত্রের কাহিনি ও দৃশ্য সংগীতের প্রভাব বৃদ্ধি করে। সংগীতকে অশ্লীল করার জন্য ও নিম্নস্তরে নামানোর জন্য ফিল্ম-সংগীত পরিচালকগণ যথেষ্ট দায়ি। এঁরা জনসাধারণের যৌন প্রবৃত্তির বিকৃতি ঘটিয়ে অর্থ সঞ্চয় করে নিজেকে সফল সংগীতজ্ঞ মনে করেন। তানসেন এবং বৈজুবাওরার মতো সংগীতজ্ঞদের খ্যাতির অসদ্ব্যবহার করে প্রচুর মুনাফা পিটিয়ে যে সকল ফিল্ম নির্মিত হয়েছে, তাতে এঁদের প্রহসনই করা হয়েছে। তানসেন' চিত্রটিতে সাইগলকে দিয়ে গানগুলি গাওয়ানো হয়েছে, সেই গানগুলির স্তর প্রারম্ভিক শ্রেণির শিক্ষার্থীদের পর্যায়ভুক্ত।

 

অধিকাংশ ফিল্ম-সংগীত পরিচালকদের এতে কিছু আসে যায় না। গায়কদেরও সেই একই দশা। উচ্চাঙ্গ সংগীতের জ্ঞান থাকার দরুন সাইগল এবং লতার গানগুলি চিরকাল জীবিত থাকবে। এঁদের গলা ভালো ও সেই সঙ্গে সাধ্যও বটে। আর. সি. বড়াল, খেমচাদ প্রকাশ এবং অমরনাথের সংগীতও স্থায়ী এবং প্রভাবশীল থাকবে, বেন না এই পরিচালকগণও উচ্চাঙ্গ সংগীতের সঙ্গে পরিচিত এবং এঁদের ভিত্তি দৃঢ় হওয়ায় এঁদের দেওয়া সুর অসংগত হয় না। এই শ্রেণিতে গোলাম হায়দার এবং নৌশাদকেও ধরা যেতে পারে। নবীন পরিচালকদের মধ্যে রোশন এবং শ্যামসুন্দর ও আনী ব্যক্তি। ফিল্ম-সংগীতের মাধ্যমে যন্ত্রসংগীতের নতুন একটা রূপ এঁরা দেখিয়েছেন। এবং এবং তা হলো গানের অন্তর্বর্তীকালীন যন্ত্রসংগীত এর দ্বারা গানের এক নতুন আকর্ষণ ও স্ফূর্তি তথা বৈচিত্র আসে। এই বিরাম সংগীতের পাশ্চাত্য ও ভারতীয় যন্ত্রসঙ্গীতের সমন্বয় সাধন করে এরা এক নতুন ধরনের আধুনিক অর্কেস্ট্রা জন্ম দিয়েছেন।

 

সেন্সর কেবল চিত্রকাহিনী, সংবাদ, গানের ভাষা এবং দৃশ্যের নিয়ন্ত্রণ করে থাকে, কিন্তু সংগীতের সুরও যদি সেন্সর নিয়ন্ত্রিত করে তবে অশ্লীল সুরের বৃদ্ধি বন্ধ করা যায়।

 

আমাদের দৃষ্টিকোণ সব সময়েই ব্যক্তিকেন্দ্রিক রয়ে গেছে। এই মনোবৃত্তির প্রভাব শিল্পকলা আর সংগীতের ওপরেও পড়েছে। তাই অর্কেস্ট্রা নামের কোনও কিছু ভারতীয় সংগীতে ছিল না। তানপুরা বা মৃদঙ্গ ব্যতীত কোনও বাদ্যযন্ত্র গায়কদের সঙ্গে থাকত না। অবশ্য গণসংগীতের অনুষ্ঠানে বহুলোক একসাথে মিলে গান-বাজনা করতেন। উচ্চাঙ্গ সংগীতে তো দ্বৈত গানেরও প্রচলন ছিল না। অবশ্য দেখা যায়, কালিদাস বা গুগুরাজাদের যুগে নৃত্যের সঙ্গে বীণা, মুরলী আর মৃদঙ্গ বাজানো হত, কিন্তু এই পদ্ধতিকে অর্কেস্ট্রা বলা চলে না।

 

প্রায় একশত বৎসর পূর্বে বাংলাদেশে সর্বপ্রথম অর্কেস্ট্রার প্রচলন হয় এবং নতুন পদ্ধতিতে বিভিন্ন ধরনের পরীক্ষা হয়। এতে তিরিশ থেকে ষাটজন পর্যন্ত বাদ্যকার থাকতেন। প্রথম দিকে বাংলাদেশে প্রসিদ্ধ যাত্রাদলসমূহের সঙ্গে অর্কেস্ট্রাবাদন শুরু হল। তারপরে রঙ্গমঞ্চেও এর কার্যক্রম চলতে থাকল। হাবু দত্ত (স্বামী বিবেকানন্দের ভাই) আর দক্ষিণাবাবু ছিলেন এর প্রবর্তক। তারপর রামপুর, বরোদা, মহীশুর প্রভৃতি রাজ্যে রাসব্যান্ড ব্যতীত ভারতীয় বাদ্যযন্ত্রেরও অর্কেস্ট্রা তৈরি হল। বোম্বাইয়ের পার্শি থিয়েটারে এর প্রচলন হয়।

 

কিন্তু তখনও এতে অর্কেস্ট্রার টেকনিক ঠিকমতো আসে নি। একই গত্-এ সব বঁটা বাদ্যযন্ত্র বাজানোকে সত্যিকারের অর্কেস্ট্রা বলে না। এতে উচ্চাঙ্গ সংগীতের আভাস হালকাভাবে থাকত।

 

বস্তুত, উচ্চাঙ্গ সংগীতের ভিত্তিতে অর্কেস্ট্রাকে এক নতুন দিগ্বদর্শন করালেন আমার গুরু ওস্তান আলাউদ্দিন খাঁ। তিনি ১৯১৮ সালে ছোট ছোট ছেলেদের নিয়ে মাইহার ব্যান্ড নামে এক অর্কেস্থা গঠন করলেন। এই অর্কেস্ট্রা বিভিন্ন সংগীত সম্মেলনে যথেষ্ট খ্যাতি অর্জন করল।

 

ওস্তাদ আলাউদ্দিন খাঁ-র কাছ থেকে প্রেরণা পেয়ে তাঁর শিষ্য তিমিরবরণ অনেক সুন্দর সুন্দর নতুন অর্কেস্ট্রার সুর তৈরি করলেন। এর দ্বারা ঊনি অর্কেস্ট্রার টেক্‌নিককে আরও উন্নত করলেন।

 

কথাকলি নৃত্যের সঙ্গে সীমিত অর্কেস্ট্রা হয়ে থাকে । দু তিনটি ঢোল  এবং গানের সহায়তায় আশ্চর্যজনক প্রভাব (এফেক্ট) উৎপন্ন হয় । এর কাছ থেকে পেল না পেয়ে সর্বপ্রথম উদয়শংকর তার একক এবং ব্যালে নৃত্য প্রভাবশালী করবার জন্য এক নতুন ধরনের অরকেসটার জন্ম দিলেন । গতানুগতিকতা কে ভেঙে ফেলে তিনি তার নৃত্যের অর্কেস্ট্রা ঢোল এবং লোকসঙ্গীতের বাদ্যযন্ত্রের সাথে সাথে উচ্চাঙ্গ সংগীতেরবাদ্যযন্ত্র প্রয়োগ করলেন। এই অর্কেস্ট্রার বিশেষত্ব এই ছিল যে, নৃত্যে যে ধরনের পদক্ষেপ, অঙ্গসঞ্চালন, ভাব, দৃশ্য প্রভৃতি থাকত অর্কেস্ট্রার সুর ঠিক তার অনুরূপ ও সহায়ক হয়। যদি কোনও নর্তক ঘোড় সওয়ারির নৃত্য দেখাত বা কোনও দৃশ্যে মেশিন চলত তা হলে বাদ্যযন্ত্রের দ্বারা ঠিক সেই প্রভাব (এফেক্ট) তৈরি করা হত। এইভাবে নৃত্যের অর্কেস্থা এক নতুন প্রাণ পেল। এই দিকে উদয়শংকরের সংগীত পরিচালক বিষ্ণুদাস শিরালি কয়েকটি নতুন এবং সফল প্রচেষ্টা করলেন এবং এক নতুন ধারার স্থাপনা করা হল যার অনুকরণ অন্যেরাও করছেন।

 

অর্কেস্ট্রায় নতুন গবেষণা

আমার নিজের ঝোঁক গোড়া থেকেই যন্ত্রসংগীতের প্রতি রয়েছে এবং আমি অর্কেস্ট্রার টেকনিকে নতুন নতুন ধারার প্রয়োগ করে চলেছি। ওস্তাদ আলাউদ্দিন খাঁর শিষ্যত্বে ভারতীয় উচ্চাঙ্গ সংগীত সাধনা করা ছাড়াও পাশ্চাত্য সংগীতের অর্কেস্ট্রা শোনবার প্রচুর অবকাশ আমি পেয়েছি। উদয়শংকর-অর্কেস্ট্রার কাছ থেকে প্রেরণা পেয়ে আমি শুদ্ধ অর্কেস্ট্রা (যা কোনও গান বা নৃত্যের সঙ্গে বাজে না) নিয়ে পরিশ্রম শুরু করে দিলাম।

 

টেকনিকের দিক থেকে আমি আমার অর্কেস্ট্রাকে চার ভাগে ভাগ করতে পারি যথা— উচ্চাঙ্গ, রাগপ্রধান, লোক এবং কাহিনি ও ভাব-প্রধান। এগুলি প্রচারিত করার সুযোগ আমি অল ইন্ডিয়া রেডিওতে পেয়েছি।

 

অর্কেস্ট্রায় সুর সৃষ্টি করবার সময় আমি এই কথা মনে রাখি যে রাগের সীমার মধ্যেই নতুন নতুন এই মধুর সুর সংযোজনা করব এবং নীরসতা সৃষ্টি হতে দেব না। দ্বিতীয় কথা এই যে কোনও একটি যন্ত্রে কোনও বিশিষ্ট সুর যদি বাজানো হয় তার পরবর্তী মুহূর্তে অন্য যন্ত্রে অন্য সুর বাজানো হয়। পছন্দসই করবার জন্য আমি গত্‌ এর প্রকৃতি অনুসারেই বাদ্যযন্ত্র বাছাই করে থাকি। কোনও কোনও সুর বাঁশিতে ভালো লাগে আর কোনও কোনও সুর সরোদ বা পিয়ানোতে। এই ধরনের সম্পূর্ণ অর্কেস্ট্রায় এক অভূতপূর্ব আনন্দ পাওয়া যায়।

 

উচ্চাঙ্গ সংগীতের বিপরীত লোকসংগীতে রাগসমূহের কোনও বহন থাকে না, কাজেই এতে নতুন সুর সৃষ্টি করার স্বাতস্য থাকে। কেবল একটু মনে রাখতে হয় যে কোথাও লোকসঙ্গীতের গতিপ্রকৃতি না বদলে যায়।

 

কাহিনী বা অরকেস্টা তে আমি নতুন নতুন প্রয়াস করেছি। কোনও সজীব নৃত্যু বা দৃশ্য সামনে থাকলে অর্কেস্ট্রার  মহতব ততটা উপলব্ধি করা যায় না যতটা করা যায় তাদের অনুপস্থিতিতে । তখন শুদ্ধ অর্কেস্ট্রায়  কল্পনা জাগাবার জন্য অনেক প্রকার কারিগরি এবং প্রভাব উৎপাদক সুরের প্রয়োজন হয়।

 

কর্ণটিক এবং উত্তর-ভারতীয় সংগীতের কোনোটার পদ্ধতি এবং কোনোটার রাগ নিয়ে আমি এক নতুন ধানের অর্কেস্থা প্রণালীর জন্ম দেওয়ার প্রচেষ্টা করছি।

 

একথা নিশ্চয়ই স্বীকার করতে হবে যে পাশ্চাত্য অর্কেস্থা সংগীত পদ্ধতি অনেক সমৃদ্ধ। তাদের বিশেষত্ব হচ্ছে 'হানি'। কিন্তু আমাদের উচ্চাঙ্গ সংগীতের প্রকৃতি এমন যে সেখানে হানির স্থান অনেক কম। এ রকম করলে উচ্চাঙ্গ সংগীতের আমার মরণ হবে। তবে হ্যাঁ, হাল্কা লঘু সুরে এর সফল প্রয়োগ করা যেতে পারে। মনে রাখা উচিত যে কেবলমাত্র তৃতীয়, চতুর্থ বা পঞ্চম সুর (সা-গা, সা-মা, সা-পা) লাগালেই হানি হয় না।

 

ওয়াল্টার কামান এবং অন্য দু-তিনজন পাশ্চাত্য সংগীতজ্ঞ— ভারতবর্ষ, মধ্যপ্রাচ্য ও চিনা সংগীতকে ভিত্তি করে অর্কেস্ট্রায় কয়েকটি সুর সৃষ্টি করেছেন যেগুলি শুনলে ওরিয়েন্টাল বলে মনে হয়। কিন্তু তাঁদের সরলতার প্রভেদ এই যে প্রাচ্য দেশীয় রাখের রূপরেখার ওপর ভিত্তি করে তাঁরা পাশ্চাত্য হারমনি পদ্ধতিতে অর্কেস্ট্রা রচনা করেছেন। এ বিষয়ে তাঁরা পারদর্শী। কিন্তু যেহেতু ভারতীয় সংগীতজ্ঞদের পাশ্চাত্য হানি পদ্ধতি সম্বন্ধে কোনও জ্ঞান নেই সেহেতু তাঁরা যে সব অর্থহীন নূর সৃষ্টি করেন সেগুলি অশ্রাব্য ও খাপছাড়া মনে হয়।

 

পাশ্চাত্য বাদ্যযন্ত্র

হ্যাঁ, অবস্থা সংগীতে আমরা পাশ্চাত্য বাদ্যযন্ত্রের পূর্ণ ব্যবহার করতে পারি। আমাদের এখানে খানে বাজাবার যন্ত্রগুলি খুব কম এবং বেহালা, চেলো, ডবল্-বেস্, ক্ল্যারিওনেট, ওবো এবং পিয়ানোর সাহায্য নিতেই হয়। কিন্তু এর সঙ্গে সঙ্গে পরিচালকদের প্রত্যেক যন্ত্রের প্রকৃতি অনুসারেই সংগীত সৃষ্টি করা উচিত এবং প্রত্যেক যন্ত্রকে সম্পূর্ণ অর্কেস্ট্রায় যথোচিত স্থান দেওয়া চাই।

 

কিন্তু যদি অর্কেস্থার প্রকৃতি ভারতীয়ই রাখতে হয় তাহলে ভারতীয় যন্ত্রগুলিকে মুখ্য স্থান দিতে হবে। পাশ্চাত্য যহুগুলিকে 'টোন্যাল ভ্যালু' বাড়াবার জন্যই ব্যবহার করা  উচিত।

 

অধুনা জীবন এত ব্যস্ত হয়ে উঠেছে যে একক গান বা যন্ত্রবাদন জনসাধারণের মাকে আকর্ষণ করতে পারে না। উচ্চাঙ্গ সংগীতকে বাঁচিয়ে রাখতে গেলে অর্কেস্ট্রা প্রচুর সহায়ক হবে, এতে বৈচিত্র এবং ভলিউম থাকে।

 

সবশেষে আরেকটি কথা বলতে চাই। ইদানিং উচ্চাঙ্গ এবং আধুনিক সঙ্গীত নিয়ে যে বাজে অভ্যাস চলছে তা অপ্রয়োজনীয়' এবং অনুচিত স্ব-স্ব পৃথক স্থান আছে ।আধুনিক ওরঙ্গজেব এর উচ্চাঙ্গ সঙ্গীতে প্রতীক উপেক্ষা এবং কাঁচা গানের প্রতি পক্ষপাতিত্বের যে ভাব আছে তা ভুল । ঠিক সেই রকম উচ্চাঙ্গ সংগীত আধুনিক সঙ্গীত শুনেই নাক সিটকানো উচিত নয় । সঙ্গীতে বৈচিত্র আনার জন্য উদ্বোধনী সংগীত হওয়া আবশ্যক।

 

ভারতীয় সংগীতে নতুন ধারার জন্ম হবার একান্ত প্রয়োজন, কারণ, কোন শিল্প যদি একই স্থানে থমকে যায় তবে তাকে সমৃদ্ধ শিল্পকলা বলা চলে না । কিন্তু এ বিষয়ে সংগীতজ্ঞদের সচেষ্ট হওয়া উচিত যাদের উচ্চাঙ্গসংগীত সম্পর্কে পূর্ণ জ্ঞান আছে ও সেইসঙ্গে নতুন কল্পনা ও বোধশক্তি আছে।

 

( গোবিন্দ মুন্সি কর্তৃক অনুদিত)

গণনাট্য পত্রিকার প্রথম বর্ষ প্রথম খণ্ড শ্রাবণ ১৩৫৯ এ (ইংরেজির ১৯৫২) এই প্রবন্ধটি প্রকাশিত হয় ।পত্রিকার সম্পাদক ছিলেন সলিল চৌধুরী।

Comments

SBJZAECOGZ128202203013