| | | | | |

চিন্তা ও সৃষ্টি | Idea and Creativity

by অমলেন্দু দাশগুপ্ত | Amalendu Dasgupta
চিন্তা ও সৃষ্টি | Idea and Creativity

আমার বন্ধু ও পরিচিত মহলে অনেকে আছেন যারা সত্যজিৎ রায়কে আমার চেয়ে অনেক আগে থেকে বা বেশি ঘনিষ্ঠভাবে জানেন। আমার পরিচয় প্রথমত চলচ্চিত্র সমালোচক হিসাবে এবং আমার সাংবাদিক জীবনের কাজকর্মের মাধ্যমে। কিন্তু এর মারফতে ক্রমশ যে একটি মূল্যবান ব্যক্তিগত যোগসূত্র গড়ে ওঠে, তার কথা মনে করে সত্যজিৎ রায়ের ৭০তম জন্মবর্ষপূর্তি-তে বিশেষ আনন্দবোধ করছি। দু'একটা ব্যক্তিগত কথা অপ্রাসঙ্গিক হবে না। তার চেয়েও বড় অবশ্য সত্যজিতের শিল্পকর্মের অভিজ্ঞতা। কিন্তু সে তো শুধু আমার একার নয়। নিজের অভিজ্ঞতার বিবরণ বা বিশ্লেষণ-ও এখানে সম্ভব নয়।

কলকাতার বাইরে ছিলাম বলে 'পথের পাঁচালি' ও 'অপরাজিত' আমি প্রথম দেখি দিল্লিতে বিশেষ প্রদর্শনীতে। তখন ‘অপরাজিত' নিয়ে আমার একটা আলোচনা দিল্লি থেকে প্রকাশিত একটি ইংরেজি সাপ্তাহিকে বেরোয়। প্রসঙ্গত লিখেছিলাম যে 'পথের পাঁচালি'র আবেদন সত্ত্বেও ‘অপরাজিত’ আরও বেশি পরিণত শিল্পকর্ম, মার সঙ্গে অপুর সম্পর্কের সূক্ষ্ম অথচ অবধারিত পরিবর্তনের বেদনায় অবিস্মরণীয়। তখনও বোধহয় এই কথা বেশি লেখা হয়নি। পরে জেনে খুশি হয়েছিলাম যে ছদ্মনামে লেখা এই আলোচনা সত্যজিতের নজরে পড়েছিল এবং উনি লেখক সম্বন্ধে কৌতূহলী হয়েছিলেন। কিন্তু পরিচয় হয় অনেক পরে।

১৯৬৬ সাল থেকে বছর দশেক আমি স্টেটসম্যান পত্রিকার চলচ্চিত্র সমালোচনা লিখি। প্রতি সপ্তাহে নতুন বাংলা ও হিন্দি ছবি দেখা এবং তা নিয়ে কিছু লেখা বহুলাংশেই যে কী কষ্টকর ছিল তা বুঝিয়ে বলার দরকার নেই। কিন্তু একটা বিশেষ ক্ষতিপূরণ ছিল এই সময়ে তৈরি সত্যজিৎ রায়ের অন্তত দশটি ছবি। আর কোনও ভালো ছবি আদৌ দেখিনি এমন নয়, কিন্তু নায়ক থেকে শুরু করে শতরঞ্জ কি খিলাড়ী পর্যন্ত সত্যজিতের ছবি বেরোবার সঙ্গে সঙ্গে দেখে এবং যথাসাধ্য তার বিশ্লেষণ ও মূল্যায়ন করে যে আনন্দ পেয়েছি সেটা অন্য জাতের। রসাস্বাদনের সঙ্গে জড়িয়ে ছিল নিজের বোধ ও বিচারের অনুশীলন।

কেউ কেউ তখন অভিযোগ করেছেন যে আমার বিচার নির্মোহ নয়, সত্যজিতের ছবির কোনও দোষত্রুটি সহজে আমার চোখে পড়ে না। কিন্তু সত্যি কথা হল যে, এই শিল্পকর্মের যেইসব দিক বা অংশ আমার খুব মূল্যবান বলে মনে হয়নি সেখানেও যে একটা বুদ্ধি, অনুভূতি ও রুচির ছাপ পেয়েছি, সব মিলিয়ে একটা ভিন্ন মানের পরিচয় পেয়েছি তাকে উপেক্ষা করতে পারিনি। ফলে আমার অতৃপ্তির কথা রূঢ়ভাবে প্রকাশ করতে পারিনি। বিশেষ করে যখন জানতাম যে রূঢ় ভাষণ লুফে নেবার জন্য অনেকেই উদ্গ্রীব হয়ে আছেন। কিন্তু বুদ্ধিমান পাঠকের নিশ্চয়ই বুঝতে অসুবিধা হয়নি কোন জিনিস আমার কাছে মূল্যবান এবং কোন জিনিস অপেক্ষাকৃত অকিঞ্চিৎকর মনে হয়েছে।

প্রসঙ্গত উল্লেখ্য যে সত্যজিৎ নিজে যদিও অনেক সময়ই আমার এইসব লেখার অকুণ্ঠ প্রশংসা করেছেন, দু'এক সময় আমার সমালোচনা পড়ে ওঁর মনে হয়েছে যে আমি কোন কোন জিনিসের সূক্ষ্ম তাৎপর্য বুঝতে পারিনি। যেমন অরণ্যের দিনরাত্রি' বা 'সীমাবদ্ধ’ সম্বন্ধে আমার যথেষ্ট উৎসাহের অভাব। কিন্তু মতভেদের মর্যাদা দিতে উনি দ্বিধা করেননি। ফলে ব্যক্তিগত আলাপ আলোচনা সহজ এবং আমার পক্ষে ফলপ্রসু হয়েছে। এই আলোচনা শুধু চলচ্চিত্র সম্বন্ধেই সীমাবদ্ধ থাকেনি। নিছক গল্পগুজব ছাড়া সাহিত্য, সঙ্গীত ইত্যাদি নানা বিষয়ে কথাবার্তা হয়েছে। এবং সবসময়-ই আমি ওর চিন্তার স্বচ্ছতায় মুগ্ধ হয়েছি।

একটা কথা আমার প্রায়ই মনে পড়ে। কথা প্রসঙ্গে জিজ্ঞাসা করেছিলাম যে উনি ‘পুতুল নাচের ইতিকথা' নিয়ে ছবি করছেন না কেন? একটু চুপ করে থেকে হঠাৎ বললেন, আচ্ছা ভেবে দেখেছেন, মতিকে নিয়ে কি করি?' এই একটা কথায় শুধু চলচ্চিত্রের প্রয়োজন নয়, উপন্যাসটির প্রকৃতি ও গঠন নিয়েও আমাকে নতুন করে ভাবাল। শশীকে কেন্দ্র করে যে জীবনপ্রবাহ বা শশী যার প্রধান দর্শক, মতির উপস্থিতি তার মধ্যে সোচ্চার নয়, কিন্তু অঙ্গাঙ্গীভাবে জড়িত। প্রথমে স্নিগ্ধ করুণ, পরে আশ ও আনন্দে উজ্জ্বল। মতিকে বাদ দেওয়া যায় না শুধু তার মাধুর্যের জন্যেই নয়, আখ্যানের সঙ্গে সে জড়িয়ে আছে ওতোপ্রোত ভাবে, এমনকি শশী-কুসুম সংবাদেও।

কিন্তু মতি হঠাৎ এই জীবনপ্রবাহ থেকে বেরিয়ে গেল। কুমুদ ও মভির কলকাতার জীবন অন্য এক স্রোতের অংশ, যদিও এখানেই প্রেমের পরিপূর্ণতা, মতির জীবনের পরিপূর্ণতা। উপন্যাসে এই ভিন্নমুখী গতির স্থান হয়, চলচ্চিত্রে হওয়া কঠিন। স্বামীর সঙ্গে মতির গ্রামে ফেরার সঙ্গে মূলপ্রবাহে প্রত্যাবর্তনের একটা সম্ভাবনা দেখা দিল। কিন্তু তা একেবারেই সাময়িক। কুমুদ আর মতি এবার শশীর চারিদিকের জগৎ থেকে একেবারেই হারিয়ে গেল। এরপরে ওদের কি হল সে সম্বন্ধে আর কোন কথা নেই। “পুতুল নাচের ইতিকথা-য় সে কাহিনী প্রক্ষিপ্ত, ওদের কথা এইখানেই শেষ হইল”। অথচ ইতিকথা এখানেই শেষ নয়, ছবিও এখানে শেষ হতে পারে না। কিন্তু ছবিতে এই ফাঁকটা অস্বস্তিকর হওয়ার সম্ভাবনা।

সত্যজিতের একটা ছোট্ট মন্তব্য নিয়ে এতটা কেন লিখলাম সে কথা নিশ্চয়ই বুঝিয়ে বলার দরকার নেই। ওঁর নানা প্রবন্ধে এই ধরনের চিন্তার নিজস্বতা, চলচ্চিত্র ভাবনার অসামান্য স্বচ্ছতার অনেক পরিচয় আছে। আরও উল্লেখ করতে হয় বাংলা ও ইংরেজীতে এই চিন্তার প্রকাশে ওঁর ভাষার সৌকর্য। ওর ইংরেজী গদ্য সম্বন্ধে আমি একসময় লিখেছিলাম যে আমাদের দেশে এরকম সিভিলাইজড প্রোজ কম লেখা হয়েছে। ওঁর মহৎ শিল্পকর্মের তুলনায় এই গুণকে গৌণ মনে হতে পারে, কিন্তু শব্দ ব্যবহারের যথাযথতা এবং শিল্পকর্মের নিপুণ সংগঠনের পেছনে বোধহয় রয়েছে একই ধরনের পরিশীলিত রুচি ও মানসিক অনুশীলন।

সত্যজিতের ছবি দেখে অভিভূত হয়েছি, লেখা পড়ে মুগ্ধ হয়েছি। সৃজনী-প্রতিভার অন্যান্য অভিব্যক্তিতে চমৎকৃত হয়েছি। গল্প, অঙ্কন, অলংকরণ বা সঙ্গীত সৃষ্টির কথা ভুলি কি করে? এই বহুমুখী গুণের অসাধারণ সমন্বয়ে বিস্মিত না হয়ে উপায় নেই। তবে শেষ পর্যন্ত সত্যজিতের চলচ্চিত্র-সৃষ্টিই আমাদের পরম প্রাপ্তি। সব ছবিই সমান তৃপ্তি দেয়নি, কিন্তু এমন ছবির সংখ্যা কম নয় যা আমাদের জীবনের শ্রেষ্ঠ চলচ্চিত্র অভিজ্ঞতার একটা বড় অংশ। অনুভব, প্রকাশ মাধ্যম ও নির্মাণশৈলীর বিশিষ্টতা এই শিল্পকর্ম আমাদের কাছে এক নতুন দিগন্তই খুলে দেয়নি, এর কাল-নিরপেক্ষ মূল্য স্বমহিমায় অম্লান। কিন্তু একথাও বিশেষভাবে স্মরণীয় যে এর উৎস শুধু স্বনির্ভর প্রতিভা বা প্রেরণা নয়। সত্যজিৎ শিখিয়েছেন যে ছবি করা শিখতে হয়। দুঃখের বিষয় বাংলা চলচ্চিত্রে এই শিক্ষা যথেষ্ট বাপ্ত হল না।

সত্যজিৎ রায় আমাদের অনেক দিয়েছেন এবং এখনও আশা আগিয়ে রেখেছেন যে আমাদের প্রাপ্তি শেষ হয়নি। ওঁর সাম্প্রতিক কাজ নিয়ে কিছু সংশয় হলেও এই আশা ত্যাগ করার কারণ দেখি না। সাময়িক শারীরিক বিঘ্ন সত্ত্বেও ওঁর শিল্পীসত্তায় অবসাদ আসেনি। ফলেই রয়েছে সৃষ্টির নতুনতর সম্ভাবনা।

 

Comments

LNXHLACAQM128202203152