| | | | | |

ডক্টর সত্যজিৎ রায় | Doctor Satyajit Ray

by তাপস সেন | Tapas Sen
ডক্টর সত্যজিৎ রায় | Doctor Satyajit Ray

প্রায় চল্লিশ বছর আগে আমরা কয়েকজন বেকারবন্ধু প্রায় বোহেমিয়ান জীবন কাটাতাম। একটা স্বপ্ন আমাকে তাড়িয়ে নিয়ে বেড়াত, ছবি তৈরি করব,  নাটক করব ইত্যাদি। আমি তখন সবে আমার হাজরা রোড়ের “ডার্করুম" মানে, মেসের অন্ধকার একতলা ঘর ছেড়ে এস আর দাস রোড়ের একটা ঘরে এসে উঠেছি। আমার রুমমেট বংশী (চন্দ্রগুপ্ত) তখন একটা আধটা ফিল্মে আর্ট ডিরেকশনের কাজ করছে। এইসময় হৃষির (হৃষিকেশ মুখার্জি) মারফত ঋত্বিক ঘটক, মৃণাল সেন, সলিল চৌধুরীদের সঙ্গে আলাপ হয়েছিল। 'ক্যালকাটা ফিল্ম সোসাইটি'র কথা কিছু কিছু কানে আসত-বোধহয় ফিল্ম সোসাইটির কয়েকটা ছবিও দেখেছিলাম। আমাদের ফিল্ম নিয়ে জল্পনা-কল্পনার অন্ত নেই, মৃণাল, আমি, ঋত্বিক, সলিল, হৃষি সবাই ভাবছি কি করে শুরু করা যায়, বিজনদাও (ভট্টাচার্য) ছিলেন আমাদের সঙ্গে। এইসূত্রে সত্যজিৎ রায়ের নামটাও কানে এসেছিল বংশীর মুখে 'মানিক-মানিক' নামটা অনেকবার বলতে শুনেছি। বংশী রেনোয়ার ‘দি রিভার' ছবির কাজের সঙ্গে যুক্ত ছিল। রেনোয়ার শিল্প নির্দেশক মঁসিয়ে লুরিয়ে আসতেন নিউ থিয়েটার্সে। সৌরেন সেনের সূত্রে তাঁর সঙ্গে আমাদের আলাপও হয়েছিল। তখনই জেনেছিলাম যে সেই ছবির নির্মাণের সঙ্গে অনেকে যুক্ত ছিলেন; তার মধ্যে হরিসাধন দাশগুপ্ত, বংশী তো ছিলই, ছিলেন রামানন্দ সেনগুপ্ত, আর একজন ছিলেন-কে-না সত্যজিৎ রায়; তখন সুকুমার রায়ের ছেলে হিসেবেই তাঁর পরিচিতি। যদিও তখন আমি সত্যজিৎ নামের সঙ্গে খুব পরিচিত হয়ে গিয়েছিলাম 'সিগনেট প্রেসের' দৌলতে। কারণ আমি তখন সিগনেটের যত বই বেরোত, যে ‘টুকরো কথা’ হত, তা পড়তাম। সিগনেটের প্রেজেন্টেশন, প্রডাকশন, পাবলিকেশন সবটাই ছিল অনবদ্য, আর তার মূলে দুজনের নাম ছিল, একজন ডি কে-দিলীপ গুপ্ত, অন্যজন হলেন সত্যজিৎ রায়, যিনি অলংকরণ, প্রচ্ছদ সবই করতেন। এখনও বিশেষভাবে মনে আছে বিষ্ণুদে-র 'নাম রেখেছি কোমল গান্ধার' এবং জীবনানন্দ দাসের ‘বনলতা সেন'-এর প্রচ্ছদ। আরও বেশি করে মনে পড়ে আম-আঁটির ভেঁপু (পথের পাঁচালি)। আমাদের ইস্কুলে ‘শ্রেষ্ঠ গ্রন্থ রচনায় আমি লিখেছিলাম যে 'পথের পাচালি' আমার পড়া শ্রেষ্ঠ বই। আমি শিল্পী সত্যজিৎ রায়ের পরিচয় পেয়ে গেছি আম আঁটির ভেঁপু’র ছবি এবং বই দেখে।

একদিন বংশীর মুখে শুনলাম যে মানিক ছবি করবে-বিভূতিভূষণ বন্দ্যোপাধ্যায়ের 'পথের পাঁচালি'। আমি শুনে প্রায় আৎকে উঠলাম। বললাম, সর্বনাশ করেছ তোমরা, সিই সর্বনাশ করে ছাড়বে। আমার জীবনের একটা সত্যিকারের সাধের বই, সেটাকেও তোমরা ফিল্ম করে নষ্ট করবে। এটা আর মোটেই ভাল লাগছে না। তারপর মাঝে মাঝেই দেখি, একজন দীর্ঘকায় ভদ্রলোক আমাদের ঘরে এসে ধোঁক করেন বংশী আছে? -না পেয়ে চলে যান। পরে বংশীকে বলি লম্বা মতন একজন ভদ্রলোকের খোঁজ করতে আসাটা-বদৌ বোঝে মানিক এসেছিল। ইতিমধ্যে বংশী সত্যেন বসুর 'ভোর হয়ে এলো ছবিতে কাজ করছে। তারও আগে জোতির্ময় রায়ের 'অভিযাত্রী' ছবিতেও কাজ করেছে, তাতে বোধহয় এক ছোট্ট চরিত্রে অভিনয়ও করেছে।

লক্ষ্য করতাম বংশী বেশি মত থাকত 'পথের পাঁচালির গল্প বলতে কীভাবে ভাটিং হচ্ছে কোথায় হচ্ছে-ইত্যাদি ইত্যাদি। একদিন শুনলাম অর্থাভাবে ছবির কাজ বন্ধ হয়ে যাচ্ছে। তবে আমি শুধু শুনে যেতাম, বিশেষ পাত্তা দিতাম না।

সত্যজিৎ রায়ের সঙ্গে ভালরকম আলাপ হয়েছিল রবীন্দ্রনাথের 'তপতী নাটকের প্রস্তুতির সময়। মঞ্চসার একটা ডিজাইন বংশী এক্সিকিউট করবে, নিউ এমপায়ার-এ অভিনয় হবে। উদ্যোগ বোধহয় পূর্ব-পরিষদের। তখনও কলকাতা শহরের মঞ্চ জগতের মঞ্চসজ্জা ও আলোক পরিকল্পনার কাজ পুরোদমে শুরু করিনি। কিন্তু আমার অনেকরকম চিন্তাভাবনা আছে। এই নাটকে আখরোট বনের একটা আভাস দিয়ে কালোর পটভূমিকায় একটা অবিস্মরণীয় সুন্দর ডিজাইন করেছিলেন, কে-না, সত্যজিৎ রায়। তাই এই নাটকে আলোর কাজ করার উৎসাহ আমার বেড়ে গেল।

তপতী নাটকে কুশীলবরা ছিলেন তৎকালীন নামী শিল্পীরা যেমন-বিকাশ রায়, নীলিমা সান্যাপ (তপতী), সুচিত্রা মিত্র (বিপাশা), রামকৃষ্ণ রায়চৌধুরী আরো অনেকে। সত্যজিৎ রায়ের মঞ্চসজ্জার ডিজাইন রূপায়ন করবে বংশী। প্রসঙ্গত উল্লেখযোগ্য যে এই নাটকের উদ্যোক্তা ছিলেন বাণীকার ও সঙ্গীতা লাহিড়ী প্রমুখ।

আমার আর ঐ নাটকে কাজ করা হয়নি। কারণ আমার পরিকল্পনা অনুযায়ী আলোক পরিকল্পনার জন্য প্রয়োজনীয় ২৫%, বরাদ অর্থের চেয়ে অনেক বেশি ছিল। কাজটা অবশেষে রৰি সেনগুপ্ত আর উৎপল দত্তকে করতে হয়েছিল।

তারপর থেকে ক্রমে ক্রমে তাকে আরও বেশি করে জানতে পারলাম। বংশী বলত “সবই অপরিচিত নতুন মুখ, ক্যামেরাম্যান সুব্রত মিত্র থেকে শুরু করে অভিনেতা-অভিনেত্রী সব” একমাত্র বংশীই যা কয়েকটা অন্য ছবিতে আগে কাজ করেছে শুনলাম রবিশঙ্কর সুর-সংযোজনার দায়িত্ব নিয়েছেন।

ছোটবেলা থেকেই বাংলা হিন্দি ছবি দেখার আমার একটা আকর্ষণ ছিল। বম্বে টকীজ, নিউ থিয়েটার্সের অনেক ছবি দেখেছি, যদিও নাটকের প্রতি আমার বেশি ইনভলমেন্ট ছিল। কিন্তু যখন পথের পাঁচালি মুক্তি পেল বসুরীতে - রাস্তাঘাটের চেহারাই কেমন বদলে গেল। রাস্তার মোড়ে বিশাল বিশাল হোর্ডিং-দুর্গার হাত ধরে অপু দৌড়চ্ছে। ছবির থেকে শুরু করে তার কম্পোজিশন, তার লে-আউট-তার পুরো ব্যাপারটাই অন্যরকম সেগুলো সত্যজিৎ রায়ের সৃষ্টি।

ছবি করতে করতে ওদের অর্থের জন্য কয়েকবার থামতে হচ্ছিল। আমিও ব্যক্তিগতভাবে দু-একজায়গায় খোঁজ-খবর করেছিলাম কি করে অর্থসংগ্রহ করা যায়। অবশেষে পশ্চিমবঙ্গ সরকারের সহযোগিতায় ব্যাপারটা সম্পূর্ণ করা সম্ভব হয়েছিল।

এই ছবি যেদিন মুক্তি পেল, সেদিনই দেখতে গেছিলাম। দেখে বিস্ময়ে হতবাক হয়ে গেছি। প্রচলিত বাংলা, হিন্দি এমনকি বিদেশী সবকিছুর চেয়ে আলাদা। শিহরিত হচ্ছিলাম এই ভেবে, যে পথের পাঁচালি' লুকিয়ে লুকিয়ে মাসিক পত্রে পড়তাম, স্কুলের রচনায় লিখেছি “আমার পড়া শ্রেষ্ঠ বই, সেই বই যিনি গ্রাম বাংলার জীবনকে এমন করে মূর্ত করেছেন। সেলুলয়েতে, তাঁর নাম সত্যজিৎ রায়। পরের দিন তাঁর লেক রোডের বাড়িতে গিয়ে হাজির হলাম। গিয়ে বললাম “সত্যজিৎ বাবু, দারুণ লেগেছে ছবি”। আমি তখন উদভ্রান্তের মত হয়ে গেছি। বললাম, আপনি একদিন আমাদের বাড়িতে আসুন”। শুনে বললেন, 'সেকি!' আমি বললাম, 'নেমন্তন্ন করলাম, যাবেন সন্ধ্যেবেলা"। তখন উনি এত ব্যস্ত হননি, পৃথিবীজোড়া নামডাক হয়নি-তখন সবে তার সূত্রপাত। হিন্দুস্থান পার্কে আমার দেড়খানা ঘরে, সত্যজিৎবাবু, বংশী, সুব্রত মিত্র আর মৃণাল সেন এলেন সন্ধ্যেবেলা। খাওয়া দাওয়া হ'ল। সুব্রত সেতারে পথের পাঁচালি ছবির দইওয়ালার সিকোয়েন্সটা একটু বাজাল। অনেক গল্প করলাম। তারপর থেকেই সত্যজিৎ রায়ের বিশ্বজোড়া সম্মান আর অভ্যর্থনা শুরু হয়ে গেল। মনে পড়ে ম্যান্ডেভিলা গার্ডেন্সের সাউথ পয়েন্ট স্কুলে আর তারপরে কলকাতা কর্পোরেশন সম্বর্ধনা দিয়েছে। তারপর আস্তে আস্তে সারা বিশ্বজুড়ে সম্বর্ধনা পেয়েছেন। কিন্তু প্রথম ভাললাগার প্রথম সামান্য আয়োজন আমার বাসায়। এখনও তাঁর ছবি দেখি, সব ছবি যে সমান ভাল লাগে তা নয়, কোন কোন ছবি মুগ্ধ করে তবে সত্যজিতের "ইনার আছ আলোছায়ার শিল্পী হিসেবে সবচেয়ে বিস্ময় জাগিয়েছিল। কিছুদিন আগের ছবি ‘শাখা প্রশাখ' সেটাও ভাল লেগেছে।

এই সুযোগে আর একটা কথা বলতে চাই। তাঁর লেখা গল্প যখন প্রথম ছেপে বেরোল (বোধহয় সন্দেশে); আমি প্রথম অভিনন্দন জানিয়েছিলাম সেটা পড়ে। উনিও সেটা মনে রেখেছিলেন। তার পর যখন উনি ডক্টরেট পেলেন (কোথা থেকে মনে নেই); আমি ফোন ধরে বললাম ‘ড. রায় আছেন? ওদিকে খুব অরাক কন্ঠস্বর, ‘কাকে খুঁজছেন’-“ড. রায় - মানে ড. সত্যজিৎ রায়, তখন উনি ওনার স্বভাবসুলভ ভঙ্গিতে খুব হাসলেন। এই আমাদের সত্যজিৎ রায়; আমার খুব কাছের মানুষ বলে আমি গর্বিত। ঊনার সৃষ্ট ছবি ও শিল্পকলার প্রতি অন্য সবার মত আমিও একজন গুণগ্রাহী ভক্ত। বিজ্ঞান সম্পর্কে আমার আগ্রহ ও কৌতূহল আছে। কিছুদিন আগে বিজ্ঞান বিষয়ক একটা নতুন প্রজেক্ট এর কথা ড. রায়কে বলেছি। উনিও সেটাতে আগ্রহ প্রকাশ করেছেন দেখা যাক।

তাঁর শিল্পশৈলীর বিভিন্ন ধারা-যেমন, লেখা, ছবি আঁকা, বিজ্ঞাপন পরিকল্পনা, সঙ্গীত ভাবনা ইত্যাদি সবটার মধ্যেই এক আশ্চর্য সমন্বয় খুঁজে পাই। তাঁর নানান বিষয়ে চিন্তা ভাবনা আমাকে মুগ্ধ করে। তাকে আরো অনেকদিন এভাবে দেখতে চাই-তাঁর সঙ্গে আমার দীর্ঘদিনের সম্পর্ক। নতুন কাজের মধ্যে সেটা হয়ত কোনওদিন সার্থকতর হবে।

Comments

AIXCRKWZYC128202212746